সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
Home Blog Page 10

মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে বাংলাদেশে স্টারলিংক

অর্থজগত প্রতিবেদন

বাংলাদেশে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবা চালু হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) স্পেসএক্সের বাণিজ্যিক বিক্রয় বিভাগের নির্বাহী স্টেফানি বেডনারেকের একটি পোস্ট পুনঃপ্রকাশ করে সংক্ষিপ্ত বার্তায় তিনি লেখেন, ‘Starlink connecting Bangladesh!’

স্টেফানি বেডনারেকের তথ্য অনুযায়ী, স্টারলিংক মোবাইল সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশের এমন অনেক মানুষ অতিরিক্ত যোগাযোগ সুবিধা পাবেন, যেখানে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের কাভারেজ সীমিত কিংবা একেবারেই নেই। স্যাটেলাইটভিত্তিক এই প্রযুক্তি বিশেষ করে দেশের দুর্গম ও উপকূলীয় অঞ্চলে মোবাইল সংযোগের পরিধি বাড়াতে পারে।

স্টারলিংকের এই প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হলো—ভূমিতে থাকা মোবাইল টাওয়ারের পরিবর্তে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মোবাইল ফোনে সংযোগ পৌঁছে দেওয়া। ফলে প্রচলিত সেলুলার নেটওয়ার্কের বাইরে অবস্থান করলেও ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট যোগাযোগ সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।

স্টারলিংক জানিয়েছে, বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটর বাংলালিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এই সেবা চালু করা হয়েছে। এর ফলে বাংলালিংকের সামঞ্জস্যপূর্ণ সিম ও ৪জি-সমর্থিত ফোন ব্যবহারকারীরা মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে থেকেও বার্তা আদান-প্রদান, অবস্থান শেয়ারসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় যোগাযোগ সুবিধা পেতে পারবেন।

দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের সেবা চালুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে প্রথম দিকের বাজার হিসেবে উল্লেখ করেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ফলে দেশের প্রচলিত মোবাইল অবকাঠামোর বাইরে থাকা বিশাল ভৌগোলিক এলাকায় যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপাঞ্চল, নদী ও হাওর-বাঁওড়ের দুর্গম এলাকা এবং সমুদ্রপথে চলাচলকারী মানুষের জন্য এই প্রযুক্তির গুরুত্ব বেশি হতে পারে। সমুদ্রে থাকা জেলে, নৌযানের কর্মী, পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত মোবাইল টাওয়ারের সীমাবদ্ধতা থাকায় স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগ বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগে মোবাইল টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে প্রচলিত নেটওয়ার্কে যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প সংযোগ হিসেবে স্টারলিংকের সেবা জরুরি বার্তা আদান-প্রদান ও অবস্থান জানানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের গভীর সমুদ্র এলাকাতেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভাবনাময়। মাছ ধরার নৌযান, সামুদ্রিক পরিবহন, গবেষণা কার্যক্রম কিংবা অন্যান্য কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য সমুদ্রের এমন অঞ্চলে যোগাযোগ ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে, যেখানে সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছায় না।

তবে সেবাটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে ডিভাইসের সামঞ্জস্য, নেটওয়ার্ক কনফিগারেশন এবং নির্দিষ্ট এলাকায় স্যাটেলাইট কাভারেজের ওপর। অর্থাৎ, প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে নয়, বরং নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা এলাকাকে সংযুক্ত করার একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থা হিসেবেই এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় দেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্যাটেলাইটভিত্তিক সরাসরি সংযোগ চালু হওয়ায় দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোয় নতুন একটি মাত্রা যুক্ত হলো। দুর্গম এলাকা থেকে সমুদ্র—মোবাইল টাওয়ারের সীমা যেখানে শেষ, সেখানেও যোগাযোগ ধরে রাখার সম্ভাবনা তৈরি করছে এই প্রযুক্তি।

মূল্যস্ফীতির চাপ ফের বাড়ল

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও ঊর্ধ্বমুখী। কয়েক মাস ধরে ওঠানামার পর সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে উঠেছে। এর প্রধান কারণ খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি। একই সময়ে মানুষের আয় বা মজুরি বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে পণ্যের দাম যে হারে বাড়ছে, মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না—ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও চাপে পড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) ও মজুরি হার সূচকের (ডাব্লিউআরআই) তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। বুধবার, ৭ অক্টোবর প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের হিসাবে দেখা যায়, আগস্টে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়েছে শূন্য দশমিক ০৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।

মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে খাদ্যপণ্যের বাজার। আগস্টে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশে। অর্থাৎ এক মাসেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে। আগস্টের ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে সেপ্টেম্বরে তা নেমে এসেছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে।

তবে খাদ্যবহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো খাদ্য মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক বেশি। গত বছরের সেপ্টেম্বরেও এ খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশীয় পয়েন্ট। ফলে শুধু খাদ্য নয়, বাসস্থান, পোশাক, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয়ও মানুষের পারিবারিক বাজেটে বড় চাপ তৈরি করছে।

গ্রাম ও শহর—দুই জায়গাতেই ঊর্ধ্বগতি

মূল্যস্ফীতির চাপ শহরের তুলনায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে কিছুটা বেশি। সেপ্টেম্বরে গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। এক মাসে সেখানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ০৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।

গ্রামীণ বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাবও স্পষ্ট। আগস্টে গ্রামীণ খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০১ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রামের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য কেনার ব্যয় আরও বেড়েছে।

তবে গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে। আগস্টে ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ থেকে সেপ্টেম্বরে এ হার নেমে এসেছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে। কমার হার খুবই সামান্য হওয়ায় সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ে এর বড় ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়নি।

শহর এলাকাতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্টে শহরের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে।

অন্যদিকে শহরের খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশে নেমেছে। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ফলে শহর ও গ্রাম—উভয় ক্ষেত্রেই খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই সেপ্টেম্বরের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।

আয় বাড়ার চেয়ে ব্যয় বাড়ছে বেশি

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির তুলনা করলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সেপ্টেম্বরে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মজুরি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগস্টে এই হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ একদিকে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির গতি কমেছে।

এর ফলে সেপ্টেম্বরেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম ছিল। দুই হারের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। অর্থনীতির ভাষায় এর অর্থ হলো, গড়ে মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, পণ্য ও সেবার দাম তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ফলে নামমাত্র আয় কিছুটা বাড়লেও সেই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হচ্ছে।

খাতভেদেও মজুরি বৃদ্ধির চিত্রে পার্থক্য রয়েছে। সেপ্টেম্বরে কৃষি খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। শিল্প খাতে এ হার ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। অর্থাৎ কোনো প্রধান খাতেই মজুরি বৃদ্ধির হার জাতীয় সাধারণ মূল্যস্ফীতির ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারেনি।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। আয়ের বড় একটি অংশ যাদের খাদ্য, পরিবহন, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো অপরিহার্য খাতে ব্যয় হয়, তাদের জন্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির অর্থ হলো অন্যান্য খাতে ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজন মেটানো। অনেক পরিবারকে সঞ্চয় কমানো, ভোগের ধরন পরিবর্তন কিংবা অপেক্ষাকৃত কম দামের পণ্য বেছে নেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।

খাদ্যবাজারই এখন বড় উদ্বেগ

সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাদ্য মূল্যস্ফীতির পুনরায় বৃদ্ধি। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে খাদ্যপণ্যের প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি পড়ে। কারণ খাদ্য কেনার ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর সুযোগ সীমিত। বাজারে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে পরিবারের মাসিক বাজেটে তার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।

অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও সেটি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। ফলে শুধু খাদ্যপণ্যের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেই মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতের দামের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ থাকায় সামগ্রিক ব্যয় কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতির গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের আয় বৃদ্ধির হার বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ শুধু বাজারে দাম কমানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়; মানুষের আয় যদি একই সঙ্গে না বাড়ে, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার সংকট থেকেই যায়।

প্রকৃত আয় নিয়ে নতুন চাপ

সেপ্টেম্বরের তথ্য মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। আগস্টের তুলনায় সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে এবং একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে। এই তিনটি প্রবণতা একসঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে ভোগ ব্যয়, সঞ্চয় এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনাতেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে স্থির বা সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিবিএস জানিয়েছে, দেশের ৬৪টি জেলার ১৪৩টি হাট-বাজার থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির হিসাব তৈরি করা হয়েছে। ফলে পরিসংখ্যানটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজার পরিস্থিতির সমন্বিত চিত্র তুলে ধরে।

সামগ্রিকভাবে সেপ্টেম্বরের তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমে যাওয়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এর বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। আগামী দিনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে খাদ্য সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

 

ডিজেলে বাড়তি কর, খেসারত দিচ্ছে অর্থনীতি

অর্থজগত প্রতিবেদন
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু পেট্রলপাম্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। ডিজেলনির্ভর পরিবহন, কৃষির সেচ, শিল্পকারখানার উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহনের খরচ—সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়ে। সেই ডিজেলের দামের একটি বড় অংশ যদি শুল্ক ও কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে চলে যায়, তাহলে বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি বাজারে সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। প্রতি লিটার ডিজেলের খুচরা মূল্য ১৩৫ টাকা হলেও এর মধ্যে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা শুল্ক ও কর হিসেবে আদায় করছে সরকার। অর্থাৎ এক লিটার ডিজেল কিনতে ভোক্তা যে অর্থ দিচ্ছেন, তার প্রায় ২৭ শতাংশই যাচ্ছে রাজস্ব হিসেবে। এর ফলে সরকার একদিকে বাড়তি রাজস্ব পাচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানি ও বিপণনের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আমদানি ব্যয় মেটাতে আর্থিক চাপে পড়ছে।
এই ব্যবস্থার প্রভাব এখন শুধু বিপিসির হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, আর ভোক্তাদের ওপরও পড়ছে পরোক্ষ চাপ। ফলে রাজস্ব বাড়ানোর বর্তমান কৌশল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বদলে গেছে করের ভিত্তি
বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে জ্বালানি তেলের শুল্ক নির্ধারণের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন। ২০২৫ সালের জুনে আমদানিকৃত জ্বালানির জন্য নির্দিষ্ট ‘ট্যারিফ ভ্যালু’ভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে সরে ‘ইনভয়েস ভ্যালু’ভিত্তিক কর কাঠামো চালু করা হয়। আগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও নির্ধারিত ভিত্তিমূল্যের কারণে লিটারপ্রতি শুল্ক-কর একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকত। নতুন ব্যবস্থায় প্রকৃত আমদানি মূল্যের ওপর কর আরোপ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে করের অঙ্কও বাড়ে।
আগের কাঠামোয় প্রতি লিটার জ্বালানিতে মোট শুল্ক-কর সর্বোচ্চ ১৬ টাকা ৭৬ পয়সার মধ্যে ছিল। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় আমদানিকৃত তেলের ইনভয়েস মূল্যের ওপর মোট ২৫ শতাংশ হারে বিভিন্ন কর নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২ শতাংশ আগাম কর এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায়।
বর্তমান বাজারদরে এই পরিবর্তনের কারণে আগের পদ্ধতির তুলনায় প্রতি লিটার ডিজেলে সরকার প্রায় ১৯ টাকা ৬ পয়সা বেশি আদায় করছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বিপিসির আমদানি ব্যয় যেমন বাড়ছে, একই সঙ্গে করের চাপও বাড়ছে। এর ফলে বিপিসির হাতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটানোর জন্য থাকা অর্থ আরও সংকুচিত হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ
ডিজেলের দাম অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা রাখে। দেশে বছরে প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়, যা মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহারের প্রায় ৬৪ শতাংশ। এর প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবহন খাতে, ১৫ শতাংশ কৃষি ও সেচে, ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং ৫ শতাংশ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব অর্থনীতির বহু খাতে একসঙ্গে পড়ে।
পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে পণ্য আনার খরচ বাড়ে। কৃষিতে সেচের খরচ বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। শিল্পকারখানায় জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়। আর এসব খরচের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধে গিয়ে পড়ে।
এ কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবকে শুধু ‘প্রতি লিটার কত টাকা’ দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। ডিজেলের দামের সঙ্গে যুক্ত করের চাপও অর্থনীতিতে দ্বিতীয় দফার মূল্যবৃদ্ধি তৈরি করতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এই প্রভাব সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে আরও দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
ব্যবসা খাতেও একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ার পাশাপাশি অনেক খাতে বিক্রি কমেছে। ফলে বাড়তি ব্যয় পুরোপুরি পণ্যের দামে যোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে মুনাফার পরিমাণ কমছে এবং নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতাও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বিপিসির সংকট আরও গভীর
কর কাঠামোর পরিবর্তনের সময়টিই বিপিসির জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও ডলারের উচ্চ বিনিময় হারের কারণে।
২১ সেপ্টেম্বর সরকার প্রধান চারটি পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ায়। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়। অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ডিজেলের এই দাম বৃদ্ধি ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় এককালীন সমন্বয়গুলোর একটি।
সরকারের যুক্তির মধ্যে ছিল বিপিসির লোকসান কমানো এবং পার্শ্ববর্তী দেশে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি কমানো। কারণ দেশের বাজারে জ্বালানির দাম প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় কম থাকলে সীমান্তপথে পাচারের আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও অস্বাভাবিক বেড়েছে।
তবে দাম বাড়ানোর পরও বিপিসির আর্থিক চাপ পুরোপুরি কমেনি। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সংস্থাটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারও বিপিসির ব্যয় বাড়িয়েছে।
২০২১ সালে এক ডলারের বিনিময় হার যেখানে প্রায় ৮৬ টাকা ছিল, ২০২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছেছে। বিপিসির হিসাবে, এই পরিবর্তনের কারণে প্রতি লিটার ডিজেলের ল্যান্ডিং কস্টে প্রায় ৫৫ টাকা অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধে নগদ অর্থের সংকট সামাল দিতে বিপিসি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল থেকেও প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে। এর ফলে একদিকে জরুরি আমদানি অব্যাহত রাখা সম্ভব হলেও, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থায়নে চাপ তৈরি হয়েছে।
কর কমানোর প্রস্তাব বিপিসির
এই বাস্তবতায় বিপিসি নিজেই বর্তমান শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থাটি ইনভয়েস ভ্যালুভিত্তিক শুল্ক-কর কমানো অথবা আগের ট্যারিফ ভ্যালু পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সুপারিশ করে।
বিপিসির যুক্তি, বর্তমান কাঠামোয় ডিজেলের ১৩৫ টাকা বিক্রয়মূল্য থেকে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা শুল্ক-কর হিসেবে চলে যাচ্ছে। আগের পদ্ধতি বহাল থাকলে কর দিতে হতো ১৬ টাকা ৭৬ পয়সা। ফলে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ১৯ টাকা ৬ পয়সা বেশি অর্থ বিপিসির হাতে থাকত।
বিপুল পরিমাণ ডিজেল বিক্রির হিসাবে এই পার্থক্য ছোট নয়। লিটারপ্রতি কয়েক টাকা কম-বেশিও বছরে বিপিসির নগদ প্রবাহে হাজার কোটি টাকার পার্থক্য তৈরি করতে পারে। তাই কর কাঠামো পরিবর্তনকে বিপিসি শুধু রাজস্ব নীতির বিষয় হিসেবে দেখছে না; এটি সংস্থাটির আমদানি সক্ষমতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।
আপাতত ঋণে স্বস্তি
তবে শুল্ক সংস্কারের উদ্যোগ আপাতত কিছুটা গতি হারিয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর সরকার বিপিসিকে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। অর্থ বিভাগ থেকে দেওয়া এই অর্থ পাঁচ বছর মেয়াদে পরিশোধযোগ্য এবং ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে। এর ফলে ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি আমদানির দরপত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ জরুরি নগদ অর্থের সংকট সাময়িকভাবে কমেছে, কিন্তু বিপিসির মূল আর্থিক সমস্যার সমাধান হয়নি। ঋণ সংস্থাটিকে কিছুটা সময় দিয়েছে; কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি পর্যায়ের কর—এই তিনটি বড় ব্যয়ের উপাদান অপরিবর্তিত থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবার তৈরি হতে পারে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, শুল্ক সংস্কারের প্রস্তাব কমিটির ওয়ার্কিং পেপারে দেওয়া হলেও জরুরি ঋণ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আর এগোয়নি।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের খোঁজ
বিপিসি শুধু কর কমানোর প্রস্তাবেই থেমে থাকেনি। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় একটি জাতীয় ‘ফুয়েল স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হলে এই তহবিল ব্যবহার করে দেশের বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প দ্রুত কার্যকর করা, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে।
এসব উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর দিক থেকেও। বর্তমানে দেশের পেট্রোলিয়াম জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের যেকোনো বড় পরিবর্তন সরাসরি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করে।
রাজস্ব নাকি মূল্যস্ফীতি—কোনটিকে অগ্রাধিকার
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই। সরকারের জন্য রাজস্ব বাড়ানো জরুরি। বিপিসির বড় লোকসান সামাল দিতেও অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু সেই রাজস্ব যদি এমন একটি খাত থেকে আদায় করা হয়, যার দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপণ্যের ব্যয়ও বাড়ে, তাহলে রাজস্ব আদায়ের পরোক্ষ অর্থনৈতিক মূল্যও বিবেচনায় নিতে হয়।
বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে জ্বালানি করের কাঠামোকে শুধু রাজস্ব আদায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। একদিকে সরকার জ্বালানি থেকে বেশি কর পাচ্ছে, অন্যদিকে সেই করের একটি অংশ অর্থনীতির উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে আবার মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। এতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে।
সর্বজনীন ভর্তুকিও এর টেকসই সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন হলে নিম্নআয়ের মানুষ, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উৎপাদনশীল খাতকে লক্ষ্য করে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি করের কাঠামো এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন, যাতে সরকারের রাজস্ব প্রবাহ বজায় থাকে, কিন্তু উৎপাদন ও ভোগ ব্যয়ের ওপর অস্বাভাবিক চাপ না পড়ে।
সব মিলিয়ে, ১৩৫ টাকার ডিজেলে ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা শুল্ক-কর আদায়ের হিসাবটি কেবল একটি রাজস্বের পরিমাণ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ও উৎপাদন খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। সাময়িক ঋণ দিয়ে বিপিসির নগদ সংকট সামাল দেওয়া গেলেও, জ্বালানি করের বর্তমান কাঠামো এবং আমদানিনির্ভরতার মৌলিক সমস্যার সমাধান না হলে সংকট বারবার ফিরে আসার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

রিজার্ভে সামান্য পতন, বিপিএম-৬ হিসাবে বেড়েছে

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সামান্য ওঠানামা দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৩৬ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৩১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।
বুধবার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রিজার্ভের সর্বশেষ এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৯ সেপ্টেম্বর দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে রিজার্ভ কমেছে প্রায় ২ কোটি ডলার। বিপরীতে আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ২ কোটি ডলার।
এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। সে সময় বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। ১৬ সেপ্টেম্বর নিজস্ব হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী ৩১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার।
১০ সেপ্টেম্বর দুই হিসাবেই রিজার্ভের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩৬ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ও ৩১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধে রিজার্ভে বড় ধরনের পতন না হলেও আন্তর্জাতিক লেনদেন, আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক পরিশোধের কারণে এতে ধারাবাহিক ওঠানামা ছিল।
৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (আকু)–এর জুলাই ও আগস্ট মাসের আমদানি বিল বাবদ ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়। বড় অঙ্কের এই বৈদেশিক পরিশোধের পর ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে রিজার্ভ কমে ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ওই সময় বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।
তবে সেপ্টেম্বরের শুরুতে রিজার্ভের অবস্থান ছিল আরও শক্তিশালী। ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার।
এ হিসাবে এক মাসের কিছু বেশি সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে রিজার্ভ প্রায় ১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার কমেছে। একই সময়ে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ কমেছে প্রায় ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। যদিও সর্বশেষ হিসাবে আগের মাপের তুলনায় বিপিএম-৬ রিজার্ভ সামান্য বেড়েছে।
রিজার্ভের এই দুই ধরনের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য মূলত গণনার পদ্ধতিগত কারণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবের মোট রিজার্ভের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ অন্তর্ভুক্ত থাকে। অন্যদিকে আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য ও নির্দিষ্ট মানদণ্ডে গণনাযোগ্য রিজার্ভকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে সাধারণত বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবের তুলনায় কম থাকে।
সাম্প্রতিক হিসাবগুলোতে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৩৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি থাকা মোট রিজার্ভ ধীরে ধীরে ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমেছে। বিশেষ করে আকু বিল পরিশোধের মতো বড় বৈদেশিক দায় মেটানোর পর রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়েছে। তবে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে রিজার্ভের অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে।

মেসির বিদায়ে নিকো পাজের আগমনী বার্তা

০

অর্থজগত ডেস্ক
লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির দিনে যেন একই সঙ্গে দেখা মিলল অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের। আকাশি-সাদা জার্সিতে মেসির দীর্ঘ ও বর্ণিল অধ্যায় যখন শেষের পথে, ঠিক তখনই নিকো পাজ নিজের পারফরম্যান্সে বুঝিয়ে দিলেন—মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রতিভা দলে তৈরি হচ্ছে।

বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচের ৬১ মিনিটে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলটি তাই শুধু স্কোরলাইন বদলানোর মুহূর্ত ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রতীক। মেসির বিদায়ের আবহে নিকো পাজের সেই গোল যেন আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্নের উত্তরও দিয়ে গেল।

আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রজন্মের সম্ভাব্য ‘নাম্বার ১০’ হিসেবে এতদিন একাধিক তরুণের নাম আলোচনায় ছিল। পাউলো দিবালা, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো কিংবা থিয়াগো আলমাদার মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়ে প্রত্যাশাও কম ছিল না। কিন্তু চলতি আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে নিকো পাজ যেভাবে নিজেকে মেলে ধরেছেন, তাতে সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

এই সময়ে তিনটি গোল করার পাশাপাশি আরও একটি গোলে অবদান রেখেছেন পাজ। শুধু গোলসংখ্যা নয়, মাঠে তার প্রভাবও ছিল চোখে পড়ার মতো। গোল করা, সতীর্থকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরেছেন।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে একই সময়ে গোল করা ও করানোর দক্ষতা খুব কম খেলোয়াড়ই দেখাতে পেরেছেন। মেসি ও দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে এমন তুলনা স্বাভাবিকভাবেই বড় প্রত্যাশা তৈরি করে। সেই কারণেই গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাজকে ‘ভবিষ্যৎ নাম্বার ১০’ হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টিও বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।

অবশ্য পাজের জন্য মেসির ছায়া নতুন কিছু নয়। প্রায় দুই বছর আগে আর্জেন্টিনা দলে অভিষেক হলেও মেসির সঙ্গে মাঠে তার খেলার সুযোগ হয়েছে মাত্র ৫৬ মিনিট। বলিভিয়ার বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই মেসির কাছ থেকে গোল করিয়ে নেওয়ার স্মৃতি অবশ্য এরই মধ্যে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একজন সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে শুধু মেসির সঙ্গে সমন্বয় করলেই যে দায়িত্ব শেষ নয়, সেটি পাজও জানতেন।

নিজের গোল করার সামর্থ্য প্রমাণ করাটাই ছিল তার সামনে বড় পরীক্ষা। বেনিনের বিপক্ষে সেই পরীক্ষায় তিনি সফল হয়েছেন দৃঢ়ভাবেই।

ম্যাচের প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার আক্রমণ ছিল অনেকটাই মেসিকেন্দ্রিক। লাউতারো মার্তিনেজ থেকে হুলিয়ান আলভারেজ—আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা বল পেলেই মেসিকে খুঁজছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে আর্জেন্টিনার আক্রমণ পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা মেসির উপস্থিতিতে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু পাজ সেই প্রবাহের বাইরে গিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে খেলেছেন।

বক্সের ঠিক বাইরে ডান দিকের জায়গাটিতে বল পাওয়ার পর তিনি মেসিকে খোঁজেননি। বরং সরাসরি গোলের দিকে শট নেন। বলটি রক্ষণ ও গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বাঁক নিয়ে আর্জেন্টিনার বাম দিকের ওপরের কোণে গিয়ে জড়ায়। নিখুঁত সেই শটে ফুটে ওঠে একজন আত্মবিশ্বাসী তরুণের মানসিকতা।

গোলটির ধরনও আলাদা করে নজর কেড়েছে। মেসির ক্যারিয়ারে এমন বাঁক নেওয়া দূরপাল্লার শট বহুবার প্রতিপক্ষের জাল কাঁপিয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপে ইরানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের সেই বিখ্যাত গোলের কথাও মনে পড়ে যায়। পরিস্থিতি এক নয়, কিন্তু শটের সৌন্দর্য ও গোল করার কৌশলে মেসির ছাপ খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল না।

তবে এটিকে মেসির অনুকরণ হিসেবে দেখলে নিকো পাজের পারফরম্যান্সের গুরুত্ব কমে যায়। বরং তা হয়ে উঠেছে এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের প্রতীকী সংযোগ। যে মেসি প্রায় দুই দশক ধরে আর্জেন্টিনার আক্রমণের প্রধান ভরসা ছিলেন, তার বিদায়ের দিনে একজন তরুণ নিজের সামর্থ্যে দেখিয়ে দিলেন—সেই জায়গাটি একদিন নতুন কেউ পূরণ করার চেষ্টা করতে পারবেন।

মেসির জন্যও মুহূর্তটি ছিল আবেগের। আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ অধ্যায়ের আবহে দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছিল। বিশ্বকাপজয়ী দলের অনেক সদস্যই ধীরে ধীরে ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে পৌঁছাচ্ছেন। ফলে নতুন প্রজন্ম কতটা দ্রুত দায়িত্ব নিতে পারবে, সেটিই এখন আর্জেন্টিনার অন্যতম বড় প্রশ্ন।

নিকো পাজের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সেই প্রশ্নের অন্তত একটি সম্ভাব্য উত্তর সামনে এনেছে।

মেসির যুগে আর্জেন্টিনা পেয়েছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং একের পর এক সাফল্য। তার নেতৃত্বে দলটি দীর্ঘ অপেক্ষার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের হারানো মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। ফলে মেসির বিদায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়; এটি আর্জেন্টিনার ফুটবলে একটি যুগের সমাপ্তি।

কিন্তু সেই সমাপ্তির দিনেই নিকো পাজের মতো একজন তরুণের উত্থান নতুন গল্পের সূচনা করছে। মেসি রেখে যাচ্ছেন যে উত্তরাধিকার, সেটি শুধু ট্রফি বা রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত এমন একটি ফুটবল সংস্কৃতি, যেখানে আর্জেন্টিনার তরুণরা চাপের মধ্যেও নিজেদের প্রকাশ করার সাহস পায়।

বেনিনের বিপক্ষে পাজের গোল তাই শুধুই একটি গোল নয়। এটি ছিল দায়িত্ব বদলের প্রতীকী মুহূর্ত—মেসির পায়ের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা অতীতের পাশে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের এক তরুণের আত্মপ্রকাশ।

আর্জেন্টিনার অতীত মেসি, বর্তমান তারই গড়ে দেওয়া দল; আর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য মুখগুলোর একজন নিকো পাজ। ৬১ মিনিটের সেই গোল যেন তিন কালকে একই বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মেসির অধ্যায় শেষ হলেও আর্জেন্টিনার গল্প থামছে না—বরং নতুন নায়কের অপেক্ষায় সেটি প্রবেশ করছে নতুন এক সময়ে।

 

এলএনজিতে ব্যয় বাড়ছে, কমছে না গ্যাসের সংকট

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানোর পরও সংকট কাটছে না। বরং এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ দ্রুত বাড়ছে, অথচ শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি—কোথাও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কোথাও সরবরাহ কম, আবার কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে নির্ধারিত সময়ে শিল্প উৎপাদন চালানো কিংবা রান্নার চুলা জ্বালিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফলে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ব্যয়বহুল এলএনজি কিনতে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় শিল্প খাতকে উৎপাদন কমানো, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার এবং বাড়তি ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। অর্থাৎ গ্যাস সংকটের কারণে একই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের আমদানি ব্যয় এবং বেসরকারি খাতের উৎপাদন ব্যয়।
এই পরিস্থিতিতে চড়া দামের স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমিয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ বাড়ানোর দিকে যাচ্ছে সরকার। তুলনামূলক কম দামে নির্ধারিত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এতে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি, এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, ভাসমান টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা এবং জরুরি মজুতের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর গ্যাসব্যবস্থাকে এখনো ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, আমদানি বাড়িয়ে তাৎক্ষণিক ঘাটতি সামাল দেওয়া গেলেও দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন না বাড়লে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান কূপের উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানির একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তিন মাসেই এক বছরের ভর্তুকির কাছাকাছি ব্যয়
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকির জন্য ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অথচ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের এলএনজি কেনাকাটির ব্যয়ই নির্ধারিত বার্ষিক ভর্তুকির কয়েক গুণ।
গত অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি ছিল ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এলএনজি আমদানিতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা গত পুরো অর্থবছরের ভর্তুকির প্রায় ৭১ শতাংশের সমান। একই ধরনের ব্যয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির প্রয়োজন ৪১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানির পরিমাণ, চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ এবং স্পট মার্কেটের দামের পরিবর্তনের ওপর প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ নির্ভর করবে।
এই বাড়তি আর্থিক চাপ বিবেচনায় চলতি অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকির বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকা করার প্রয়োজনের কথা জানিয়ে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে সংশোধিত বাজেটের আগে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে অর্থ বিভাগ জানিয়েছে। ফলে অর্থবছরের বাকি সময়ে এলএনজি আমদানির অর্থ জোগান দেওয়া নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এলএনজির ব্যয় যে গত কয়েক বছরে কতটা বেড়েছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় আমদানির পরিসংখ্যানেও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১০ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪১ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে আমদানির পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারদর ও আমদানি ব্যয়ের চাপও বহুগুণে বেড়েছে।
স্পট মার্কেটে বাড়ছে ঝুঁকি
এলএনজির বাজার অন্যান্য অনেক জ্বালানির তুলনায় বেশি অস্থির। বিশেষ করে স্পট মার্কেটে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে কার্গো কেনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য পরিবর্তনও বড় ধরনের ব্যয় তৈরি করতে পারে। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, উৎপাদনকারী দেশে সরবরাহ বিঘ্ন কিংবা শীত মৌসুমে চাহিদা বেড়ে গেলে দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ১০ থেকে ১২ মার্কিন ডলারে কিনতে পারত। সাম্প্রতিক সময়ে সেই দাম বেড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ডলারে উঠেছে। চলতি অক্টোবরের জন্য কেনা কয়েকটি স্পট কার্গোর দামও প্রায় ২৭ থেকে ২৯ ডলার পর্যন্ত পড়েছে।
অন্যদিকে কিছু স্বল্পমেয়াদি ও চুক্তিভিত্তিক কার্গোর ক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউ দাম প্রায় ২৫ দশমিক ২৬ থেকে ২৫ দশমিক ৩৫ ডলারের মধ্যে রয়েছে। এতে স্পট মার্কেটের তুলনায় চুক্তিভিত্তিক সরবরাহে কিছুটা কম খরচের সুযোগ দেখা যাচ্ছে। তবে সব কার্গোর ক্ষেত্রে একই হারে সাশ্রয় হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ ক্রয়ের সময়, সরবরাহের শর্ত, মূল্য নির্ধারণের সূত্র এবং পরিবহন ব্যয় ভিন্ন হতে পারে।
আরও বড় সমস্যা হলো, কম দামে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলেও কোনো কারণে সেই সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে তাৎক্ষণিক ঘাটতি মেটাতে আবার স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। তখন বেশি দাম দিয়েই জ্বালানি কিনতে হয়। আবার কার্গো দেশে পৌঁছালেও ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে তা জাতীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব না হলে আমদানির পুরো ব্যয়ই কার্যত চাপ সৃষ্টি করে, কিন্তু তার বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ পাওয়া যায় না।
স্পট কেনাকাটা কমানোর উদ্যোগ
ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার পরিমাণ কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে পেট্রোবাংলা। তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজারের নির্ভরযোগ্য ও সক্ষম সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বেশি দামের স্পট কার্গোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহের অংশ বাড়ানো।
তবে এই কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নির্ধারিত সরবরাহকারী কোনো কার্গো দিতে ব্যর্থ হলে কিংবা চুক্তিভিত্তিক সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হলে জাতীয় চাহিদা পূরণে আবার স্পট মার্কেটে ফিরতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা অনেকটাই আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি বর্তমানে বন্ধ থাকলেও আগামী বছরের শুরুতে আবার চুক্তিভিত্তিক আমদানি শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে জ্বালানি বিভাগ। এটি বাস্তবায়িত হলে তুলনামূলক পূর্বানুমানযোগ্য দামে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর পাশাপাশি নতুন এলএনজি সরবরাহকারী তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গত ২৯ আগস্ট সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়। আবেদনের সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়ে সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর করা হয়েছে। তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত একটি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং কমপক্ষে ৫ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে। একক প্রতিষ্ঠান কিংবা যৌথ উদ্যোগ—দুই ধরনের আবেদনই গ্রহণযোগ্য। আগে তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের নতুন করে আবেদন করার প্রয়োজন নেই।
শিল্পে গ্যাস সংকটের সরাসরি মাশুল
সরকারের জন্য এলএনজি আমদানির ব্যয় বাড়লেও শিল্প খাতে তার সুফল পুরোপুরি পৌঁছাচ্ছে না। বরং গ্যাসের চাপ ও সরবরাহের ঘাটতি উৎপাদন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে পোশাক ও নিটওয়্যার খাতের বিভিন্ন কারখানায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে কিছু পোশাক কারখানায় উৎপাদন একপর্যায়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। কিছু নিটওয়্যার কারখানায় উৎপাদন কমেছে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে এগুলো নির্দিষ্ট কারখানা ও উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতা; পুরো শিল্প খাতের উৎপাদন একই হারে কমেছে—এমন সামগ্রিক হিসাব নয়।
গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে কারখানাগুলোকে উৎপাদন পরিকল্পনা বারবার পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কোথাও একাধিক ধাপে উৎপাদন পরিচালনা করা হচ্ছে, কোথাও কম চাপের কারণে মেশিন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর ফলে উৎপাদনের সময় বাড়ছে এবং বাড়ছে শ্রম, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়।
নির্ধারিত সময়ে রফতানি পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকিও বাড়ছে। বৈশ্বিক পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় বাড়তি উৎপাদন ব্যয় সবসময় বিদেশি ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে গ্যাস সংকটের মাশুল শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তার মুনাফা, নতুন বিনিয়োগ এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর পড়ছে।
বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
গ্যাসের চাপ কমে গেলে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের মতো বিকল্প জ্বালানির দিকে যেতে হয়। এতে সরাসরি জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়। আবার গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমলেও কারখানার ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় একই থাকে। ফলে কম পরিমাণ পণ্যের ওপর একই স্থায়ী ব্যয় ভাগ হওয়ায় প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
এই বাড়তি ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়। রফতানি বাজারে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে গেলে নতুন অর্ডার, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে কিছু কোম্পানি খুচরা মূল্য অপরিবর্তিত রেখে পণ্যের আকার বা পরিমাণ কমানোর মতো কৌশলও নিচ্ছে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে বর্তমানে সর্বোচ্চ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা যাচ্ছে। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে কিংবা এলএনজি আমদানিতে কোনো বাধা তৈরি হলে সরবরাহ আরও কমে ২২৫ থেকে ২৩০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে।
অর্থাৎ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েও এই ব্যবধান পুরোপুরি দূর করা যাচ্ছে না। ফলে এলএনজি আমদানিতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরও শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে না।
এই বাস্তবতায় সংকটটি শুধু আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর নয়; বরং গ্যাসের পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা, দেশীয় উৎপাদন, আমদানি অবকাঠামো এবং সঞ্চালন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। কোনো একটি জায়গায় দুর্বলতা থাকলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে আমদানি করা এলএনজিও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারে না।
আমদানিনির্ভরতার ফাঁদ থেকে বের হওয়ার প্রশ্ন
এলএনজি আমদানি তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাসের ঘাটতি সামাল দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর নির্ভরশীল এই ব্যবস্থা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ায় এবং বৈশ্বিক সংকট তৈরি হলে আমদানি ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের অস্থিরতা থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। এজন্য পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন কূপ খনন, স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক অনুসন্ধান জোরদার এবং দ্রুত গ্যাস উত্তোলনের অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি দ্বিমুখী চাপের চিত্র তুলে ধরছে—গ্যাস পেতে সরকারকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, আবার সেই গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্প খাতকেও উৎপাদন কমিয়ে বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আবাসিক গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি।
ফলে এলএনজি আমদানির ব্যয় কমানো নিছক বাজেট ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি এখন শিল্প উৎপাদন, রফতানি সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চুক্তিভিত্তিক আমদানি বাড়ানো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে বড় ধরনের অগ্রগতি না হলে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও গ্যাস সংকট থেকে বের হওয়া কঠিনই থেকে যাবে।

কর আদায় বাড়ছে, লক্ষ্য অর্জনের আশা

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশে কর আদায়ের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চলতি অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশে কর আদায়ের প্রবণতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষকে কর প্রদানে আরও উৎসাহিত করতে হবে। করদাতাদের মধ্যে কর দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি কর ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যাগুলোও সমাধান করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশের করব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে দুই দিক থেকেই সমস্যা ছিল। একদিকে করদাতাদের জন্য জটিলতা ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে কর আদায়ের কাঠামোতেও নানা ধরনের দুর্বলতা ছিল। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে ধীরে ধীরে দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, কর প্রদান যেন মানুষের কাছে ভোগান্তির বিষয় না হয়, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। করদাতারা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হয়ে সহজ ও সঠিক প্রক্রিয়ায় তাদের কর পরিশোধ করতে পারেন, সে জন্য করব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার চেষ্টা চলছে।
তার মতে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে শুধু করের হার বা আদায়ের চাপ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। করদাতার আস্থা তৈরি, সেবার মান উন্নয়ন এবং কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সংস্কারের মাধ্যমে করের আওতা ও আদায়—দুই দিকেই অগ্রগতি আনা সম্ভব।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর আশাবাদ, চলমান উদ্যোগের ফলে রাজস্ব আদায়ের গতি আরও বাড়বে এবং চলতি অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

ঝুঁকিহীন আয়ের ফাঁদে বিনিয়োগকারী

০

অর্থজগহ প্রতিবেদন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজ খুলে নিজেদের অনুমোদিত বা সার্টিফায়েড আর্থিক পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। দ্রুত ও নিশ্চিত মুনাফার আশ্বাস দিয়ে পরিচালিত এসব প্রচারণা শুধু বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে ফেলছে না, একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে আস্থার সংকটও তৈরি করছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক এসব প্রতারণার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহের মধ্যেই বড় অঙ্কের অর্থ আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। অথচ পুঁজিবাজারে কোনো বিনিয়োগই সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই ভবনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে নিজেদের অনুমোদিত কিংবা সার্টিফায়েড আর্থিক পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এসব গ্রুপে দ্রুত বড় মুনাফা, নির্দিষ্ট সময়ে নিশ্চিত আয় কিংবা প্রায় ঝুঁকিহীন বিনিয়োগের মতো প্রলোভন দেখানো হয়। ফলে অভিজ্ঞতা ও পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়াই অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী এসব প্রস্তাবের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন।
বিশেষ করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে বিনিয়োগের অর্থ কয়েক গুণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। দুই সপ্তাহের মতো স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের আয় করার সুযোগ রয়েছে—এমন প্রচারণা বিনিয়োগকারীদের বাস্তব ঝুঁকি সম্পর্কে বিভ্রান্ত করছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ব্যক্তিগতভাবে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাজার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাও তৈরি হচ্ছে।
মমিনুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করা ব্যক্তিদের জন্য শেয়ারের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কোনো কোম্পানির শেয়ারের দামে হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। এ অবস্থায় যাচাই-বাছাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বা ব্যক্তিগত পরামর্শ অনুসরণ করলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য, যথাযথ বিশ্লেষণ এবং দায়িত্বশীল আর্থিক পরামর্শের গুরুত্ব অনেক বেশি। বাজারে কোনো শেয়ারের দাম বাড়া বা কমার পেছনে প্রকৃত কারণ কী, কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা কেমন এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি কতটা—এসব বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুঁজিবাজারের তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম দ্রুত মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এর ইতিবাচক দিক থাকলেও যাচাইহীন তথ্য, গুজব, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা এবং কৃত্রিমভাবে বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করার সুযোগও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোনো শেয়ারের দাম বা লেনদেনকে প্রভাবিত করতে পরিকল্পিতভাবে তথ্য ছড়িয়ে দিলে তা বাজার কারসাজির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ডিএসই চেয়ারম্যান। বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন, দামের অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং সন্দেহজনক প্রচারণা শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু হলে বিপুল পরিমাণ বাজার তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক লেনদেন বা আচরণের ধরন শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর প্রচারণার সঙ্গে বাজারের লেনদেনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে।
তবে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি দিয়ে এ ধরনের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি বাজারে শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আস্থাভাজন আর্থিক মধ্যস্থতাকারী ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বিনিয়োগকারীরা যাতে বৈধ ও দায়িত্বশীল উৎস থেকে নির্ভরযোগ্য পরামর্শ পান, সে জন্য নিবন্ধিত ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক, আর্থিক পরামর্শদাতা ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘নিশ্চিত মুনাফা’ বা ‘ঝুঁকিহীন আয়’—এ ধরনের কোনো ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। শেয়ারের মূল্য বাজারের চাহিদা-জোগান, কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সুদের হার, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। ফলে স্বল্প সময়ে নিশ্চিতভাবে বড় মুনাফার প্রতিশ্রুতি নিজেই একটি সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের কোনো ব্যক্তি বা অনলাইন গ্রুপের পরিচয় যাচাই না করে অর্থ বিনিয়োগ না করা, অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতিতে সতর্ক থাকা এবং শেয়ার কেনাবেচার আগে কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য ও নির্ভরযোগ্য বাজার বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া বিনিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্যকে সরাসরি সত্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে এর উৎস ও বৈধতা যাচাই করা জরুরি।
বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬-এর আলোচনায় উঠে আসা এসব বিষয় মূলত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা ও সুরক্ষার গুরুত্বকেই সামনে এনেছে। বাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে একদিকে যেমন প্রতারণা ও কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন, তেমনি অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য তথ্যের স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি এবং দায়িত্বশীল আর্থিক পরামর্শের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৩৮২ কোটি ডলার

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ বেড়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়ে ৩৮২ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। রপ্তানি আয় বাড়লেও আমদানি ব্যয় তার চেয়ে অনেক দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় ঘাটতি বড় হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট সময়ে দেশে মোট আমদানি ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল এর চেয়ে ১২ দশমিক ১ শতাংশ কম। বিপরীতে, একই সময়ে রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৩৮ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। ফলে পণ্য আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান আরও প্রশস্ত হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৯৬ কোটি ডলার।

বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও বৈদেশিক লেনদেনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক চলতি হিসাবে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জুলাই-আগস্টে দেশের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত তিন গুণের বেশি বেড়ে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ উদ্বৃত্ত ছিল ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। মূলত প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধিই চলতি হিসাবের এই উন্নতির প্রধান ভিত্তি।

অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রবাসী আয় প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫৮৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ রেমিট্যান্সের প্রবাহে ধারাবাহিক উন্নতি দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

তবে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। জুলাই-আগস্ট সময়ে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৪৯ কোটি ডলার, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ১২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে আমদানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্যের আমদানি ব্যয়ও বাড়ায় সামগ্রিক আমদানি চাপ আরও বেড়েছে। তবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি না থাকায় বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের গতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় একদিকে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

এদিকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৭৪৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। তবে রপ্তানি আয়ের এই প্রবৃদ্ধি আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম হওয়ায় সামগ্রিক বাণিজ্য ভারসাম্যের উন্নতি হয়নি।

আর্থিক হিসাবে বাড়ছে চাপ

চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকলেও দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ আর্থিক হিসাবে অর্থের বহিঃপ্রবাহ বেড়েছে। এর ফলে চলতি হিসাবের ইতিবাচক অবস্থান সত্ত্বেও সামগ্রিক ব্যালান্স অব পেমেন্টসে চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমে যাওয়া এ ক্ষেত্রে বড় একটি কারণ। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অর্থছাড় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ২৯ কোটি ১০ লাখ ডলারে নেমেছে। বিপরীতে একই সময়ে ঋণের আসল পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৫৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন ঋণের অর্থছাড়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বেশি থাকায় আর্থিক হিসাবে ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে ট্রেড ক্রেডিটের নেতিবাচক অবস্থানও বৈদেশিক লেনদেনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ফলে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ ও চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক বৈদেশিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি আসেনি।

উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি অর্থছাড়েও ধীরগতি

বিদেশি অর্থায়ননির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও অর্থছাড়ের গতি কমেছে। প্রকল্পের অনুমোদন, কাজের অগ্রগতি, দরপত্র ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এর অন্যতম কারণ হতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে যুক্ত শর্ত পূরণে বিলম্ব হলেও প্রকল্পে অর্থছাড় বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ অবস্থায় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যেসব প্রকল্পে অর্থছাড় আটকে আছে, সেগুলোর প্রতিবন্ধকতা দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধান করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং বিদেশি অর্থছাড়ের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে অর্থ ব্যবহারের দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়বে।

অর্থনীতির বৈদেশিক খাতকে আরও স্থিতিশীল করতে শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় প্রবাহ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্সই বাণিজ্য ঘাটতি ও অন্যান্য বৈদেশিক চাপের বিপরীতে সবচেয়ে কার্যকর ভারসাম্য তৈরির উৎসগুলোর একটি।

সব মিলিয়ে, অর্থবছরের শুরুতে রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আমদানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক অর্থায়নের কার্যকর ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়ানোর ওপর এখন বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে।