অর্থজগত প্রতিবেদন
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩২টি কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক ফলাফল ও ডিভিডেন্ড ঘোষণায় বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। বাকি ৯টি কোম্পানি কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি। সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় কোম্পানিটির ডিভিডেন্ডের হার কমেছে। অন্যদিকে, লোকসানে থাকা চারটি কোম্পানিও নামমাত্র ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূল্যসংবেদনশীল তথ্য এবং লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সিয়াল পোর্টালে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনায় এসব চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত কোম্পানিগুলোর ঘোষণায় মূলত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক ফলাফল উঠে এসেছে। তবে জিএসপি ফাইন্যান্সের তথ্য ২০২৫ সালের সমাপ্ত অর্থবছরের, যা অন্য কোম্পানিগুলোর তথ্যের সঙ্গে তুলনার ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
ইউনাইটেড পাওয়ার ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য ৬০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে এর পরিমাণ ৬ টাকা। কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ১৫ টাকা ৯৪ পয়সা। আগের অর্থবছরে ৬৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ মুনাফার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য থাকলেও এবার শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ডিভিডেন্ডের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটি।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছে এমজেএল বাংলাদেশ। এ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় ১১ টাকা ৪ পয়সা। তমিজউদ্দিন টেক্সটাইল ১৩ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে; কোম্পানিটির ইপিএস ৪ টাকা ২৯ পয়সা। এই তিন প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ডের হার তুলনামূলক বেশি হলেও বাকি কোম্পানিগুলোর মধ্যে মুনাফা ও ডিভিডেন্ডের অনুপাত এক নয়।
১০ শতাংশ বা তার বেশি ডিভিডেন্ডের তালিকায় রয়েছে আমান ফিড, সামিট পাওয়ার, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, এডিএন টেলিকম, বিডিকম অনলাইন, আরগন ডেনিমস, আমান কটন ও প্রিমিয়ার সিমেন্ট। এর মধ্যে আমান ফিড ও সামিট পাওয়ার ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ করে এবং অন্য কোম্পানিগুলো ১০ শতাংশ করে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের ইপিএস ৮ টাকা ২৬ পয়সা হলেও ডিভিডেন্ডের হার ১০ শতাংশ। বিপরীতে আমান ফিডের ইপিএস মাত্র ২৪ পয়সা, অথচ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোম্পানিটি ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছে।
অন্যদিকে, কয়েকটি কোম্পানি তুলনামূলক কম হারে ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। শাশা ডেনিমস ও সোনারগাঁও টেক্সটাইল ৫ শতাংশ করে, ন্যাশনাল পলিমার ও ইফাদ অটোস ৩ শতাংশ করে, ইভিন্স টেক্সটাইল ও জেএমআই হসপিটাল ২ দশমিক ৫০ শতাংশ করে এবং বিডি অটোকারস ২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া আলহাজ্ব টেক্সটাইল ও গোল্ডেন হার্ভেস্ট ১ শতাংশ করে, বিবিএস কেবলস ও ওরিজা অ্যাগ্রো শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করে এবং ড্রাগণ সোয়েটার শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
তালিকার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, লোকসানে থাকা চারটি কোম্পানিও ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। আলহাজ্ব টেক্সটাইলের শেয়ারপ্রতি লোকসান ২ টাকা ৮৫ পয়সা, গোল্ডেন হার্ভেস্টের ৫৭ পয়সা, বিবিএস কেবলসের ৫ টাকা ৮ পয়সা এবং ড্রাগণ সোয়েটারের ৪৫ পয়সা। লোকসানের মধ্যেও এসব কোম্পানি নামমাত্র ডিভিডেন্ডের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ মানেই কোম্পানির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ক্ষেত্রে নগদ প্রবাহ, সঞ্চিত মুনাফা, ঋণের বোঝা ও পরিচালন আয় বিশ্লেষণ করা জরুরি।
অন্যদিকে, কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি আজিজ পাইপস, জিলবাংলা সুগার, শ্যামপুর সুগার, জিএসপি ফাইন্যান্স, উসমানিয়া গ্লাস, বিবিএস, ইনফরমেশন সার্ভিসেস, জাহিন স্পিনিং ও পেনিনসুলা চিটাগাং। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত ইপিএস ঋণাত্মক। এর মধ্যে জিলবাংলা সুগারের শেয়ারপ্রতি লোকসান ৭২ টাকা ৩২ পয়সা এবং শ্যামপুর সুগারের ৪২ টাকা ৯৪ পয়সা। জিএসপি ফাইন্যান্সের লোকসান ৮ টাকা ৮৯ পয়সা, উসমানিয়া গ্লাসের ৪ টাকা ৭৯ পয়সা এবং আজিজ পাইপসের ৩ টাকা ৭৭ পয়সা।
কোম্পানিগুলোর ঘোষণায় আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ড সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রযোজ্য; স্পনসর ও পরিচালকেরা এর বাইরে রয়েছেন। ফলে ঘোষিত ডিভিডেন্ডের হার দেখার পাশাপাশি কারা এর সুবিধা পাবেন, সেটিও বিনিয়োগকারীদের যাচাই করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ডিভিডেন্ডের এই চিত্রে একদিকে শক্তিশালী মুনাফা করা কোম্পানির উচ্চ ডিভিডেন্ড দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে লোকসান ও দুর্বল আয় থাকা প্রতিষ্ঠানের নামমাত্র ডিভিডেন্ড কিংবা ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্তও সামনে এসেছে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ডিভিডেন্ডের হার নয়, কোম্পানির আয় কতটা টেকসই, নগদ প্রবাহ কেমন, ঋণের পরিমাণ কত এবং বাজারদরের তুলনায় ডিভিডেন্ড থেকে প্রকৃত রিটার্ন কত—এসব বিষয় একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।


