সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

যুদ্ধের শঙ্কায় ছয় মাসের সর্বোচ্চ দামে তেল

অর্থজগত প্রতিবেদন

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার উদ্বেগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। এক দিনের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে জ্বালানি মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ার পাশাপাশি ইরানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে—এমন আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সরবরাহ পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে।

সর্বশেষ লেনদেনে ডিসেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৭ দশমিক ৬৪ ডলারে উঠেছে। লেনদেনের একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারের এই প্রধান তেলসূচকের দাম ১১৮ ডলারও ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ১২ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুধু সাম্প্রতিক এক দিনের লেনদেনেই সীমাবদ্ধ নয়। গত অক্টোবর মাসজুড়েই জ্বালানি পণ্যের বাজারে উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। মাস শেষে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দীর্ঘ সময় ধরে তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় রাখছে।

বাজারের অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা বা নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দাবি, এক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী সুপারট্যাংকারকে কেন্দ্র করে চারটি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ইরানি কর্তৃপক্ষের নিষিদ্ধ ঘোষিত পথে চলাচলের সময় দুটি ট্যাংকার মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এসব ঘটনার স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ ধরনের দাবি আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে পরিবহন ব্যয়, বিমা প্রিমিয়াম ও সরবরাহ খরচ বেড়ে যাবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের দামেও পড়তে পারে।

তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতের ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। সংঘাতের বিস্তার এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত