সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

এলপিজির বাজারে সংকট, বাড়তি দামের চাপ

অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশের খুচরা বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ভোক্তারা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ দিয়েও কোথাও কোথাও সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। আবার কিছু এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, আমদানি অর্থায়নে জটিলতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা মিলিয়ে এলপিজির বাজারে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। তবে এই সংকটের আড়ালে খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে এলপিজির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। অন্যদিকে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বাজারে চাহিদা ও জোগানের ব্যবধান আরও বেড়েছে। ফলে আমদানিনির্ভর এই জ্বালানির বাজারে সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে ভোক্তাদের ওপর।
আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং জাহাজ পরিবহনের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এশিয়ার বাজারে এলপিজি আমদানির খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানি ব্যয় মেটাতে ব্যাংকঋণ ও অর্থায়ন পাওয়ার সীমাবদ্ধতা। ফলে চাহিদা থাকলেও সব প্রতিষ্ঠান আগের মতো নিয়মিত আমদানি করতে পারছে না। এতে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ বাড়ছে।
আমদানি ব্যয় ও অর্থায়নের সংকট
এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহের পাশাপাশি দেশে আমদানি অব্যাহত রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা কয়েকটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে পণ্যের প্রাপ্যতার ওপর।
ওমেরা পেট্রোলিয়ামের চিফ অপারেটিং অফিসার মাথেন্দ্র ডি যয়োশার ভাষ্য অনুযায়ী, আমদানি অর্থায়নে জটিলতা ও পরিচালনগত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত আমদানি চালু রেখেছে। তবে সামগ্রিক বাজারে সরবরাহের ঘাটতি থাকায় তাদের বিদ্যমান সরবরাহ সক্ষমতার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ কোনো একটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত আমদানি করলেও পুরো বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আমদানি অর্থায়নের প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে আমদানিকারক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং পরিবেশকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা সংকট দীর্ঘায়িত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় বাড়ছে পরিবহন ব্যয়
এলপিজির সরবরাহ সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থার অস্থিরতাকেও দায়ী করছে খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। আইগ্যাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাসের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংকটের কারণে জাহাজ চলাচল ও গন্তব্য পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। এ অঞ্চলে পণ্য আনতে আমদানিকারকদের বাড়তি প্রিমিয়ামও দিতে হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এলপিজি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফেরার বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে সময় লাগতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রভাব দেশের এলপিজি সরবরাহে আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রি
এলপিজির বাজারে সংকটের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ। ওমেরা পেট্রোলিয়ামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। কিন্তু কোনো কোনো খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে এর চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কোম্পানিগুলোর দাবি, তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মূল্য অনুসরণ করে পণ্য বিক্রি করছে। তাদের আমদানি ও বিক্রিসংক্রান্ত নথিপত্রও যাচাই করা সম্ভব। আইগ্যাসের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, তাদের আমদানি ও বিক্রির তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে এবং এসব তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ আছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, বাজারে দাম নির্ধারণের বিষয়টি কোনো একক কোম্পানির হাতে নয়; নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্ধারিত মূল্য সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য।
তবে আমদানিকারক পর্যায়ে নির্ধারিত মূল্য অনুসরণের দাবি থাকলেও খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগের নিষ্পত্তি জরুরি। সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী বাড়তি অর্থ আদায় করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হলে তার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা ছাড়া ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষিত করা কঠিন।
সংকট নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
এলপিজির বর্তমান বাজার পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার পাশাপাশি অর্থায়ন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকির দুর্বলতাও বড় ঝুঁকি। পাইপলাইনের গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেই অনুযায়ী আমদানি ও বিতরণব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে আমদানি অর্থায়ন সহজ করা, নিয়মিত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবহনসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে খুচরা বাজারে বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করতে নিয়মিত তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
সব মিলিয়ে, এলপিজির বাজারে স্বস্তি ফেরার বিষয়টি একক কোনো প্রতিষ্ঠানের আমদানি সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে না। আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা, আমদানি অর্থায়নের সুযোগ, পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং কার্যকর বাজার তদারকি—এই চারটি ক্ষেত্রেই অগ্রগতি প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ না থাকলে নির্ধারিত মূল্য থাকলেও ভোক্তাদের বাড়তি দামে সিলিন্ডার কেনার চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হতে পারে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত