সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

প্রবৃদ্ধি ৩.২%, মূল্যস্ফীতি ১০.৯%

অর্থজগত প্রতিবেদন
লতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় চার দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে উঠে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির নতুন প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩.২ শতাংশ। অন্যদিকে, গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১০.৯ শতাংশে। অর্থনীতির এই দুই সূচকের বিপরীতমুখী গতিপথ দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক (ডব্লিউইও) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির প্রক্ষেপণ বাড়ানো হয়েছে কয়েক ধাপ। ফলে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের গতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

চার দশকের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা
আইএমএফের পূর্বাভাস সত্যি হলে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি গত প্রায় ৩৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল পর্যায়ে নেমে আসতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩.১১ শতাংশ। এরপর দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এত কম প্রবৃদ্ধির নজির পাওয়া যায়নি। এমনকি করোনা মহামারির অভিঘাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার সময় ২০১৯-২০ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৪৫ শতাংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রবৃদ্ধির ধারাও অর্থনীতির গতি শ্লথ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৫ শতাংশ, যা পরের অর্থবছরে বেড়ে ৩.৬ শতাংশে দাঁড়ায়। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩.২ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা করা হয়েছে।
এপ্রিল মাসে প্রকাশিত পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪.৩ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছিল আইএমএফ। পরে জুলাইয়ে সেই পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.৫ শতাংশ করা হয়। সর্বশেষ প্রতিবেদনে তা আরও ০.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংস্থাটির মূল্যায়নে ধারাবাহিক অবনতি ঘটেছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসেও ব্যবধান
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীর পূর্বাভাসও তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস ৪ শতাংশ। এর বিপরীতে আইএমএফের ৩.২ শতাংশের প্রক্ষেপণ দেশের অর্থনৈতিক গতি নিয়ে তুলনামূলক বেশি সতর্কতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে পূর্বাভাসগুলোর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তিনটি সংস্থার মূল্যায়নেই অর্থনীতির সামনে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রবৃদ্ধি কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতের সম্প্রসারণ প্রত্যাশিত গতি না পেলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রবৃদ্ধি কমলেও কমছে না মূল্যস্ফীতির চাপ
অর্থনীতির জন্য আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী পূর্বাভাস। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশে উঠতে পারে। এপ্রিল মাসে প্রকাশিত পূর্বাভাসে এ হার ৬ শতাংশ ধরা হয়েছিল। নতুন প্রক্ষেপণে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বেড়েছে ৪.৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।
প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ বাড়াতে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে থাকলে নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর প্রকৃত আয় কমে যায়। এতে ভোগব্যয় সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মূল্যস্ফীতির উচ্চ হার ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। উৎপাদন, পরিবহন, কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে উদ্যোক্তাদের মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে ঋণের ব্যয় ও বাজারে চাহিদার পরিস্থিতি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং প্রবৃদ্ধির মন্থরতা পরস্পরকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগ সচল রাখার চ্যালেঞ্জ থাকে। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন আরও সংকুচিত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হয়। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ
আইএমএফের পূর্বাভাসে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ব্যবধানও স্পষ্ট হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ এবং ভুটানে ৬.৯ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে সীমিত থাকার আশঙ্কা করা হয়েছে। এতে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
প্রবৃদ্ধির এই ব্যবধানের পেছনে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, বিনিয়োগ, উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও নীতিগত পরিস্থিতির পার্থক্য ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করা।

সংস্কার ও অর্থায়ন নিয়ে বাড়ছে গুরুত্ব
ব্যাংককে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠকের মধ্যে সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাস প্রকাশিত হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কার কর্মসূচি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ অবস্থায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা কমানো, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, আর্থিক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো অর্থনীতির গতি ফেরানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে আইএমএফের পূর্বাভাসই চূড়ান্ত ফল নয়; বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নীতিগত পদক্ষেপ এবং দেশি-বিদেশি অর্থনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চিত্র বদলাতে পারে। তা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো এবং মূল্যস্ফীতির প্রক্ষেপণ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে অর্থনীতির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্ট হয়েছে। এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল প্রশ্ন হলো, কীভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফিরিয়ে আনা যায়।

 

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত