অর্থজগত প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির সংস্কার শর্ত বাস্তবায়নে সময় ও অগ্রাধিকারের বিষয় নিয়ে আলোচনা চললেও সংস্থাটির সঙ্গে বড় ধরনের নীতিগত মতপার্থক্য নেই বাংলাদেশের। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে সরকার। আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান জটিলতা কাটিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এই কাঠামোর আওতায় আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা আরও পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়ে আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু নির্দিষ্ট সংস্কার ইস্যুতে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। একসঙ্গে অনেকগুলো সংস্কার বাস্তবায়নের চাপ তৈরি না করে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে পদক্ষেপ নিতে চায় সরকার। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলেও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে জ্বালানি খাতে ব্যয় বেড়েছে। এই চাপ সামাল দিতে বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার পাশাপাশি অতিরিক্ত ঋণ পাওয়ার বিষয়েও সরকার আশাবাদী। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হলে ভর্তুকির প্রয়োজন তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতের অর্থনৈতিক ঘাটতি ও বিদ্যমান চাপ মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আগামী দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি আর্থিক সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলার বিষয়েও বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা চায় সরকার।
ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন ও মূলধন ঘাটতি পূরণের বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ থেকে আট বছর ব্যাংকিং খাতে প্রতিবছর প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এ জন্য সরকারি অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা হলেও দীর্ঘমেয়াদি এই চাহিদা শুধু রাষ্ট্রীয় তহবিল দিয়ে পূরণ করা কঠিন। ফলে বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজছে সরকার।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠনে সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি ইকুইটি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে আগে যে উদ্বেগ ছিল, তা অনেকটাই কমেছে। ব্যাংকে আমানত ফিরছে এবং নিট আমানতের পরিমাণ বাড়ছে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বাংলাদেশের বাজারে নতুন করে বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, রাজস্ব ঘাটতি কমাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের সুফল পাওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে আয়কর আদায়ে প্রায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাতও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা এবং রাজস্ব আয় বাড়ানো—এই চারটি ক্ষেত্রকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করে এগোতে চায় সরকার। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংস্কার বাস্তবায়নের গতি, অর্থায়নের প্রাপ্যতা এবং অর্থনীতির ওপর বিদ্যমান চাপ কতটা কমানো যায়, তার ওপর।


