সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

২৪/৭ শুল্কায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি

অর্থজগত প্রতিবেদন
বন্দর ও কাস্টম হাউসে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন শুল্কায়ন কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতায় এর সুফল পুরোপুরি মিলছে না। বিশেষ করে ব্যাংকিং সময়ের বাইরে অর্থ পরিশোধের সুযোগ সীমিত থাকা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের ছুটির দিনে সীমিত উপস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম ও ঢাকা কাস্টম হাউসে পণ্য খালাসের গতি ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমদানিকারকদের দ্রুত পণ্য ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।

বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে গত ১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বন্দর ও কাস্টম হাউসগুলোতে ২৪/৭ কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর আওতায় সপ্তাহের সাত দিনই শুল্কায়ন ও পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সচল রাখার কথা। তবে বাস্তবে কাস্টমসের কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যাংকিং ও অন্যান্য সহায়ক সেবার সময়সূচির সামঞ্জস্য না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না।

সমস্যার অন্যতম বড় জায়গা আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা। রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট বা আরটিজিএস ব্যাংকিং সময়ের বাইরে এবং সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে। ফলে এসব সময়ে বন্দরের বিল তৈরি হলেও আমদানিকারক বা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা তাৎক্ষণিকভাবে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন না। একই সঙ্গে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ বা এনপিএসবির লেনদেন সীমাও বড় অঙ্কের বন্দর বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে।

পণ্য খালাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত দুই ডজনের বেশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছুটির দিনের সীমিত কার্যক্রম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ফলে কাস্টমস ২৪ ঘণ্টা চালু থাকলেও পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল একইভাবে সচল না থাকায় কাঙ্ক্ষিত গতি পাওয়া যাচ্ছে না।

২৪ ঘণ্টা পেমেন্ট সেবা চায় বন্দর

নিরবচ্ছিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আরটিজিএস ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা এবং এনপিএসবির লেনদেনসীমা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। এ বিষয়ে গত ১ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় সংস্থাটি।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ রেফায়েত হামিম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, বন্দর ২৪ ঘণ্টা সচল থাকায় গভীর রাত এবং শুক্রবার-শনিবারসহ সরকারি ছুটির দিনেও বিপুলসংখ্যক বিল অনলাইনে তৈরি হচ্ছে। বিলিং ব্যবস্থা পুরোপুরি অনলাইন হলেও ব্যাংকিং চ্যানেল ও পেমেন্ট গেটওয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে ডিজিটাল পেমেন্টের পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।

বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, যেকোনো সময় বিভিন্ন অঙ্কের বিল তৈরি হতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং সময়ের পর এবং ছুটির দিনে আরটিজিএস বন্ধ থাকায় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা সঙ্গে সঙ্গে বিল পরিশোধ করতে পারেন না। আবার এক লাখ টাকার কম অঙ্কের বিল আরটিজিএসের মাধ্যমে পাঠানোর সুযোগও নেই।

এনপিএসবির ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট সীমা। ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে দিনে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং একবারে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা যায়। করপোরেট অ্যাকাউন্টে দৈনিক সীমা ২৫ লাখ টাকা এবং একক লেনদেনে ৫ লাখ টাকা। অথচ বন্দরের বিভিন্ন অপারেশনাল বিল অনেক সময় এসব সীমার চেয়ে বেশি হওয়ায় এনপিএসবির মাধ্যমে সেগুলো পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। ফলে ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমদানিকারকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ছুটিতে কমেছে কনটেইনার ডেলিভারি

চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও এ সমন্বয়হীনতার প্রভাব দেখা গেছে। গত ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর সাপ্তাহিক ছুটিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ১ হাজার ৩২৮টি বিল অব এন্ট্রি দাখিল হয়। এর মধ্যে ৩১টি চালানের অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন করে ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়।

তবে একই সময়ে বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারির পরিমাণ স্বাভাবিক কর্মদিবসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বন্দর থেকে ২ হাজার ৪২৩ টিইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছে। স্বাভাবিক কর্মদিবসে যেখানে এ সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টিইইউএস।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, বিল অব এন্ট্রি দাখিল পণ্য খালাসের প্রাথমিক ধাপ মাত্র। এরপর অ্যাসেসমেন্ট, শুল্ক পরিশোধ, শিপিং এজেন্টের কাছ থেকে ডেলিভারি অর্ডার সংগ্রহ এবং বন্দর থেকে পণ্য বের করে নেওয়াসহ একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এসব ধাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সমানভাবে সচল না থাকলে শুধু কাস্টমস চালু রেখে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও ছুটির দিনে ট্রাক ও ট্রেইলারের সংকট এবং আমদানিকারকদের সীমিত কার্যক্রমকে কম ডেলিভারির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে।

ঢাকা বিমানবন্দরেও বাড়ছে খালাস না হওয়া পণ্য

একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। ছুটির দিনে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের উপস্থিতি কম থাকায় আমদানি পণ্য খালাসের গতি কমে যাচ্ছে। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক রাগীব সামাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন জমতে থাকা খালাস না হওয়া পণ্যের পরিমাণ ৪০০ থেকে ৫০০ টনে পৌঁছেছে।

এ অবস্থায় কাস্টমসকে সাত দিনের মধ্যে অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন করার বিধান কার্যকর করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন পড়ে থাকা চালান নিলামে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের পক্ষ থেকেও ছুটির দিনে অতিরিক্ত শ্রম ব্যয় মেটাতে প্রণোদনা বা বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে।

সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া ২৪/৭ কার্যক্রম কঠিন

ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানিকারকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে বন্দরে পণ্য ফেলে রাখেন না। কাস্টমস, ব্যাংকিং, বন্দর এবং অন্যান্য সেবার মধ্যে কোনো একটি পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হলেই পুরো খালাস প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে। বিশেষ করে পণ্য আমদানির সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২৬টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকায় একটি প্রতিষ্ঠানের সীমিত কার্যক্রমও পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের আরেকটি অভিযোগ, ছুটির দিনে বিভিন্ন শাখা থেকে কর্মকর্তাদের এনে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট শাখার নির্দিষ্ট শুল্কায়ন পদ্ধতি, এসআরও এবং মূল্যায়নসংক্রান্ত নিয়ম সম্পর্কে তাদের সবার সমান অভিজ্ঞতা থাকে না। এতে কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পণ্য ছাড়ের প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হয়।

ব্যবসায়ীদের মতে, সরকার যদি সাত দিনই কাস্টমস কার্যক্রম চালু রাখতে চায়, তাহলে স্বাভাবিক কর্মদিবসের মতো পর্যাপ্ত জনবল, ব্যাংকিং সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট সব সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কাস্টমসের দরজা খোলা রাখলেই ২৪/৭ পণ্য খালাস ব্যবস্থা কার্যকর হবে না।

রাজস্ব আদায়ের চাপও বাড়ছে

২৪/৭ কাস্টমস কার্যক্রম চালুর সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৪ হাজার ১৭.৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫১২.৬৬ কোটি টাকা।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, বন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি ২৪/৭ চালু হলে আমদানি পণ্যের শুল্ক দ্রুত আদায় হবে এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়বে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, এ উদ্যোগের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে পুরো পণ্য খালাস ব্যবস্থার সমন্বিত সক্ষমতার ওপর।

কাস্টমস, বন্দর, ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক—প্রতিটি পক্ষ একই সময়সূচিতে এবং একই গতিতে কাজ করতে না পারলে ২৪/৭ শুল্কায়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে। তাই বন্দর ও কাস্টমসের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত উপস্থিতি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

সর্বাধিক পঠিত