অর্থজগত প্রতিবেদন
গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতি ইউনিটে ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কমতে পারে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করছে সরকার। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রাথমিক বিনিয়োগ, অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১ হাজার ৮৭১ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৫৭৮ দশমিক ৪১৫ মেগাওয়াট। এই সক্ষমতার ১ হাজার ২০০ দশমিক ৯৪ মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত এবং ৩৭৭ দশমিক ৪৭ মেগাওয়াট গ্রিডের বাইরে রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির অবদান বাড়লেও দেশের সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় এর ব্যবহার এখনো সীমিত।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলমের মতে, ব্যক্তি পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি সরকারের আর্থিক চাপও কমানো সম্ভব। বিশেষ করে, যেসব পরিবার ও প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি, তাদের জন্য ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
দিনের বেলায় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য শিল্পকারখানাগুলোকে সাধারণত প্রতি ইউনিটে ১১ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ১৬ টাকা ৬ পয়সা পর্যন্ত দিতে হয়। বিপরীতে, ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের খরচ আনুমানিক ৪ থেকে ৫ টাকা। ফলে উৎপাদিত বিদ্যুতের পুরোটাই নিজস্ব কাজে ব্যবহার করা গেলে গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়েও সাশ্রয় পাওয়া সম্ভব।
শফিকুল আলমের হিসাব অনুযায়ী, ভূমিতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয় প্রায় ৮ থেকে ৯ টাকা। সরকার জমি, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা দিলে এই ব্যয় কমে গড়ে ৬ টাকা ৫০ পয়সায় নেমে আসতে পারে। এসব সুবিধা না থাকলে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হয়। অন্যদিকে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কম হওয়ায় শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনে এ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যেও প্রচলিত বিভিন্ন জ্বালানির তুলনায় সৌরবিদ্যুতের ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা স্পষ্ট। সংস্থাটির হিসাবে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে ব্যয় হয় ১৩ টাকা ১৩ পয়সা। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই ব্যয় ২৭ টাকা ৪০ পয়সা। আর দেশীয় গ্যাস থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় আনুমানিক ৭ টাকা ৯ পয়সা। ফলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সৌরবিদ্যুতের অর্থনৈতিক সুবিধা নির্ধারণে শুধু উৎপাদন খরচ বিবেচনা করলেই হবে না। প্যানেল ও অন্যান্য সরঞ্জাম স্থাপনের প্রাথমিক ব্যয়, অর্থায়নের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারির প্রয়োজন এবং ব্যবহারের ধরনও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। এসব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়ের হিসাব করা হলে বিনিয়োগের প্রকৃত লাভজনকতা নিরূপণ করা সহজ হবে।
দেশে সৌরবিদ্যুতের কার্যকারিতার একটি উদাহরণ শেরপুরের নকলা উপজেলার হুজুরীকান্দা গ্রামের মতি অ্যাগ্রিভোলটাইক প্রকল্প। প্রকল্পটির পরিচালক শহিদুল ইসলাম জানান, নিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সেচপাম্প ও কার্যালয়ের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সেখানে মোট ৩৫ দশমিক ৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার দুটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
এর মধ্যে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের জন্য ২৬ দশমিক ৫ কিলোওয়াট এবং সেচপাম্প ও কার্যালয়ের জন্য ৮ দশমিক ৮ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রকল্পটিতে স্থাপিত সৌর প্যানেলের মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। এর আনুমানিক আয়ুষ্কাল ২৫ বছর। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, রক্ষণাবেক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের ব্যয় বাদে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ টাকা। উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ায় প্রকল্পটির কার্যক্রমে লোডশেডিংয়ের সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন পরিচালক।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানোই নয়, উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার ক্ষেত্রেও সুবিধা পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে সেচ, খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো কাজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, কোনো বাড়িতে প্রায় নয় ঘণ্টার বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমপরিমাণ সংরক্ষণক্ষমতাসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে ২০ বছরে প্রতি ইউনিটের আনুমানিক ব্যয় ৭ টাকা ৪৩ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব। যদিও বাস্তবে এই সাশ্রয় নির্ভর করবে স্থাপনের খরচ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ, ব্যাটারির আয়ুষ্কাল ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের ওপর।
সৌরবিদ্যুতের প্রসার বাড়াতে সরকারও কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি নির্দিষ্ট কিছু সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সুবিধা ১৮০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে। পাশাপাশি, ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহ দিতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের আরেকটি সুবিধা হলো, উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি ভবনের নিজস্ব চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা যায়। এতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমে। আবার উৎপাদনের অতিরিক্ত অংশ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ থাকলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আর্থিক কার্যকারিতাও বাড়তে পারে। তবে এ সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের কারিগরি ব্যবস্থা, সংযোগপ্রক্রিয়া ও প্রণোদনা বাস্তবায়নে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হাসান মেহেদীর মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং দামের অস্থিরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সৌরবিদ্যুতের মতো স্থানীয়ভাবে ব্যবহারযোগ্য উৎস সম্প্রসারণ করলে আমদানি ব্যয়ের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায়ও অবদান রাখা সম্ভব।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাতেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। সরকারের ২০২৬-২০৩০ মেয়াদি জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভূমিতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে বিপিডিবি নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, ২০২৮ সালের মধ্যে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৯ টাকা ১২ পয়সা দরে ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১২টি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের (আইপিপি) সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া নিজস্ব অর্থায়নে গ্রিড-সংযুক্ত ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যেগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে নতুন বাণিজ্যিক, শিল্প ও সরকারি ভবনে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের শর্ত বাস্তবায়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে, যেসব স্থাপনার বৈদ্যুতিক লোড ১০ কিলোওয়াটের বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে এ শর্ত কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রাথমিক ব্যয়ের বাধা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এদিকে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান সামাল দিতে সরকারের ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা কমাতে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যবহার কমানো গেলে দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ব্যবস্থাপনাও সহজ হতে পারে।
তবে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ বা সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্কছাড় যথেষ্ট নয়। সহজ অর্থায়ন, নির্ভরযোগ্য গ্রিড সংযোগ, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় ও প্রকৃত সাশ্রয়ের হিসাব নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে গ্রাহকেরা বিনিয়োগের সুফল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান।
সব মিলিয়ে, সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশদূষণ কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগকে বাস্তব সুফলে রূপ দিতে হলে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, কৃষি ও বাণিজ্যিক ভবনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগকে আরও কার্যকর করতে হবে।
সৌরবিদ্যুতে ইউনিটে সাশ্রয় ৫–৬ টাকা
শেয়ার বাজারে নজরদারিতে দুর্বল, ঝুঁকিতে বিনিয়োগকারী
অর্থজগত প্রতিবেদন
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রোকারেজ হাউস ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী সমিতিগুলোর কার্যক্রমে সেই দায়িত্বের প্রতিফলন যথেষ্ট নয়। একের পর এক অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ উঠলেও সমিতিগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে সদস্য প্রতিষ্ঠানের স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর স্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন বা সদস্যদের সচেতন করাই যথেষ্ট নয়; অনিয়ম শনাক্ত করা, অভিযোগের তদন্ত এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে।
স্বনিয়ন্ত্রণে কাঠামোগত দুর্বলতা
শেয়ার বাজারে স্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, পেশাগত মান নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। এ ব্যবস্থায় সমিতিগুলো সদস্যদের আচরণবিধি প্রণয়ন, তা অনুসরণে বাধ্য করা এবং অনিয়মের প্রাথমিক তদন্তে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর কার্যকর ক্ষমতা ও দায়িত্বের সীমাবদ্ধতা এ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রেখেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বনিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নির্ভর করে সমিতিগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা দৃঢ় থাকে, তার ওপর। কোনো প্রতিষ্ঠান অনিয়মে জড়ালে কেবল সতর্কবার্তা দেওয়া কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি ঠেকানো কঠিন। প্রয়োজনে সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকলে স্বনিয়ন্ত্রণ কার্যত আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খানও এ ক্ষেত্রে সমিতিগুলোর সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, সদস্য প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারলেই স্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর হবে। অর্থাৎ, সমিতির দায়িত্ব শুধু সদস্যদের ব্যবসায়িক সুবিধা নিশ্চিত করা নয়; বরং তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাও।
সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সমিতি কার্যত নিষ্ক্রিয়
দেশের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডস থাকলেও সংগঠনটির কার্যক্রম কার্যত নিষ্ক্রিয়। সম্পদ ব্যবস্থাপকদের বড় একটি অংশের অনাগ্রহও সংগঠনটির কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে। এর পেছনে সংগঠনের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
বর্তমান কাঠামোয় প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য একটি করে ভোটের ব্যবস্থা রয়েছে। এতে বেশি সম্পদ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য এবং সমিতির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কোনো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে সমিতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ নতুন সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেয়। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাতে সম্মতি দেয়নি। ফলে খাতটির জন্য একটি কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগও বাধার মুখে পড়ে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, সম্পদ ব্যবস্থাপকদের জন্য কার্যকর ও প্রাণবন্ত একটি সমিতি গঠনের সুযোগ তৈরি করতে কমিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন জানাবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে খাতটির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি পেশাগত আচরণবিধি ও জবাবদিহির কাঠামো শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নতুন সংগঠন গঠনই যথেষ্ট নয়; এর পরিচালন কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও কার্যকর হতে হবে।
মিউচুয়াল ফান্ডে ঝুঁকির ধরন বদলাচ্ছে
সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতে প্রতারণার অভিযোগের ক্ষেত্রে মেয়াদি বা ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অনেক সম্পদ ব্যবস্থাপকের মতে, এ ধরনের ফান্ড পরিচালনার সময়ই অনিয়মের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটেছে। বর্তমানে ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের সংখ্যা কমছে এবং নতুন ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের অনুমোদন দেওয়া বন্ধ রেখেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এর বিপরীতে উন্মুক্ত বা ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের বিস্তার বেড়েছে। এসব ফান্ডে বিনিয়োগকারীরা নিট সম্পদমূল্য বা এনএভির ভিত্তিতে ইউনিট বিক্রি করে অর্থ তুলে নিতে পারেন। ফান্ড ব্যবস্থাপকদের দাবি, বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহারের এ সুযোগ থাকায় অর্থ আত্মসাতের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
তবে ফান্ডের ধরন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সব ধরনের অনিয়মের ঝুঁকি দূর হয়ে যায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অর্থের ব্যবহার, সম্পদ সংরক্ষণ, হিসাবের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে সঠিক তথ্য প্রকাশ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। ফান্ড উন্মুক্ত হোক বা মেয়াদি, ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই শুধু ফান্ডের কাঠামোর ওপর নির্ভর না করে ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে মোট ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ব্যবস্থাপনার আওতায় ছিল। এর মধ্যে ৯ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা ছিল ওপেন-এন্ড ফান্ডের অধীনে। অর্থাৎ, মোট সম্পদের বড় একটি অংশ এখন এমন ফান্ডে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। এ বিপুল সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সম্পদ সংরক্ষণকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।
বিএসইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিউচুয়াল ফান্ডের বিদ্যমান বিধিমালায় কাস্টডিয়ান বা সম্পদ সংরক্ষণকারীদের দায়িত্ব সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর ফলে ফান্ডের সম্পদ সংরক্ষণ ও তদারকিতে তাদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বিধিমালায় দায়িত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি তা বাস্তবে যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
ব্রোকারদের সমিতির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মতো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংগঠনটি থাকা সত্ত্বেও তামহা সিকিউরিটিজ ও মশিহর সিকিউরিটিজসহ কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা ব্রোকারদের ওপর নজরদারিতে বিদ্যমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
বিএসইসির এক কর্মকর্তার মতে, বিভিন্ন দেশে ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সমিতি প্রাথমিক পর্যায়ে সদস্যদের কার্যক্রম তদারক করে। কিন্তু বাংলাদেশের ডিবিএর কর্মকাণ্ড মূলত সদস্যদের স্বার্থ রক্ষাকেন্দ্রিক। লেনদেনের ক্ষেত্রে উচ্চতর ফি-সীমার সুযোগ বাড়ানোর দাবিকে এ প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
অন্যদিকে ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা সংগঠনটির নেই। কোনো ব্রোকারের লাইসেন্স স্থগিত হলে তার সদস্যপদও স্থগিত থাকে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করার বিষয়টি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এ অবস্থায় সমিতির দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। সদস্যদের কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ উঠলেও সংগঠনটি যদি নিজস্ব উদ্যোগে তদন্ত করতে না পারে কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা না রাখে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি প্রতিরোধে তার ভূমিকা সীমিত থাকবে। আবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হলে সেই সময়ের মধ্যে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
তবে এ সমস্যার সমাধান হিসেবে সমিতিকে অনিয়ন্ত্রিত শাস্তিমূলক ক্ষমতা দেওয়াও যথেষ্ট নয়। অভিযোগ যাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের ব্যবস্থা রেখে ক্ষমতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এতে একদিকে সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে সমিতির ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও কমবে।
আন্তর্জাতিক চর্চায় বিনিয়োগকারী সুরক্ষাই মুখ্য
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ফিন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেটরি অথরিটি বা ফিনরার কথা উল্লেখ করা যায়। ব্রোকারদের অর্থায়নে পরিচালিত হলেও সংস্থাটির প্রধান লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং সিকিউরিটিজ খাতে ন্যায়সংগত ও সৎ কার্যক্রম নিশ্চিত করা।
প্রতারণা, অনৈতিক আচরণ কিংবা গ্রাহকের সম্পদের অপব্যবহারের মতো অভিযোগে ফিনরা বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০২৩ সালে এসডব্লিউ ফাইন্যান্সিয়ালকে বহিষ্কার করে সংস্থাটি। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের আগের শেয়ারসংক্রান্ত বিনিয়োগে পারিশ্রমিক সম্পর্কে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করা, অতিরিক্ত লেনদেন এবং প্রতিনিধিদের কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারক করতে ব্যর্থতার মতো বিষয় এ সিদ্ধান্তের কারণ ছিল।
এ উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, স্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সদস্যদের অর্থায়ন বা প্রতিনিধিত্বের বাইরে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে মূল বিবেচনায় রাখতে হয়। পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং বাজারে পেশাগত আচরণের মান বজায় রাখার সক্ষমতাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মডেল হুবহু অনুসরণের পরিবর্তে দেশের বাজারের আকার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও আইনগত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দায়িত্ব ও ক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে। সমিতিগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণ এবং বিএসইসির বিধিবদ্ধ নজরদারির মধ্যে সমন্বয় থাকলে অনিয়ম শনাক্ত করা এবং দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা সহজ হতে পারে।
ক্ষতিপূরণ তহবিলেও সীমাবদ্ধতা
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা বা অর্থ ও সিকিউরিটিজ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সহায়তার জন্য দেশে ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড বা বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল রয়েছে। ২০০০ সালের আগস্টে গঠিত এ তহবিল থেকে নির্ধারিত শর্তে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে তহবিলের আকার সীমিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত ক্ষতির পুরোটা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
নিয়ম অনুযায়ী, ব্রোকারদের প্রতি প্রান্তিকে পাঁচ হাজার টাকা করে এ তহবিলে জমা দিতে হয়। এ ছাড়া কনসলিডেটেড কাস্টমারস অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) রাখা আমানতের সুদ থেকে অর্জিত অর্থের ২৫ শতাংশ তহবিলে স্থানান্তরের বিধান রয়েছে। কিন্তু এ অর্থের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত হওয়ায় বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির সঙ্গে প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের ব্যবধান থেকে যেতে পারে।
সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হারানো ব্যক্তিদের জন্য এ সীমা পর্যাপ্ত কি না, তা পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে কোনো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘ ও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু ক্ষতিপূরণ তহবিলের ওপর নির্ভর না করে গ্রাহকের অর্থ ও সিকিউরিটিজের হিসাব নিয়মিত যাচাই, সম্পদ পৃথকভাবে সংরক্ষণ এবং অনিয়মের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
একই সঙ্গে তহবিলের অর্থের পরিমাণ, অবদান নির্ধারণের পদ্ধতি এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের শর্ত সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে। বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণের তুলনায় তহবিলের সক্ষমতা দুর্বল থাকলে সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা তৈরি করা কঠিন হবে।
আস্থা ফেরাতে জবাবদিহির বিকল্প নেই
বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের সঙ্গে অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগ গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিনিয়োগকারীরা যখন মনে করেন, তাঁদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোই যথাযথভাবে জবাবদিহির আওতায় আসছে না, তখন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগ্রহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে ব্রোকারেজ হাউস ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু বিনিয়োগকারী সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি পুরো বাজারের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামো গঠন, স্বার্থের সংঘাত কমানো এবং স্বাধীনভাবে অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী সদস্যদের বিরুদ্ধে সতর্কতা, সাময়িক স্থগিতাদেশ কিংবা সদস্যপদ বাতিলের মতো আনুপাতিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে। এসব ব্যবস্থা বিএসইসির নিয়ন্ত্রক ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়াও জরুরি।
পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা, গ্রাহকের অর্থ ও সিকিউরিটিজের নিয়মিত নিরীক্ষা এবং ক্ষতিপূরণ তহবিলের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। অভিযোগ ওঠার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অনিয়মের আগাম সংকেত শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, শেয়ার বাজারে স্বনিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা কেবল সমিতির অস্তিত্ব বা নীতিমালার ওপর নির্ভর করে না। নিরপেক্ষ নজরদারি, প্রয়োগযোগ্য শাস্তি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কার্যকর প্রতিকার—এই চারটি উপাদানের সমন্বয়েই বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। তা না হলে সমিতিগুলো সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব করলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা রক্ষায় তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাবে।
স্বপ্নের অর্থনৈতিক অঞ্চল, বাস্তবায়নে স্থবিরতা
বিশেষ প্রতিবেদন
দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড)। প্রায় ৩৩ হাজার একর জমিতে বিস্তৃত এই মেগা প্রকল্পকে ঘিরে একসময় যে উচ্চাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবায়নের ধীরগতিতে তা এখন প্রশ্নের মুখে। এক দশক পেরিয়ে গেলেও বিশাল এই শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ জমি অনুন্নত পড়ে রয়েছে। কারখানা নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ পাওয়া অনেক উদ্যোক্তা এখনো কাজ শুরু করতে পারেননি। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেছে, তাদেরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অনিশ্চয়তা।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উৎপাদন ও রফতানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এখানে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের রফতানি আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণে বিলম্ব, জমি হস্তান্তরের জটিলতা, শ্রমিকদের আবাসন ও নিরাপত্তার ঘাটতি এবং সরকারি অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে। আরও ১৫টি প্রতিষ্ঠানের কারখানা নির্মাণাধীন। প্রায় ৩৩ হাজার একরের এই প্রকল্পে এ পর্যন্ত উন্নয়ন করা হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৫০০ একর জমি। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩৪টি প্লট। অর্থাৎ, বিপুল জমি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও শিল্পায়নের বাস্তব অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত।
এ পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে দেশি বিনিয়োগ এসেছে ১২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৮ হাজার মানুষের। অথচ প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রাথমিক পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে রফতানি লক্ষ্যমাত্রায়। ২০৩০ সালের মধ্যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে ৪ হাজার কোটি ডলারের পণ্য রফতানির পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত রফতানি হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পণ্য। অর্থাৎ, নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় অর্জন এখনো নগণ্য। বেজার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে এখানে ৫৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ২ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা ছিল। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আগের প্রাক্কলনে চলতি দশকের শেষ নাগাদ মোট বিনিয়োগ ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছিল।
এই পরিসংখ্যান প্রকল্পটির সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবায়নগত দুর্বলতাও স্পষ্ট করে তুলছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য শুধু জমি অধিগ্রহণ বা প্লট বরাদ্দই যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগকারীদের জন্য উৎপাদন শুরুর উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাও সমান জরুরি। মিরসরাইয়ে সেই প্রস্তুতির ঘাটতিই এখন শিল্পায়নের গতি আটকে দিচ্ছে।
জমি বরাদ্দ, তবু কারখানা নির্মাণে অনিশ্চয়তা
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য জমি বরাদ্দ পাওয়ার পর উদ্যোক্তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়ার কথা কারখানার নকশা, নির্মাণ ও উৎপাদন প্রস্তুতি। কিন্তু জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জমির উন্নয়ন, প্লটের সীমানা নির্ধারণ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ শেষ না হওয়ায় কারখানা নির্মাণে অগ্রসর হতে পারছেন না অনেকে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতিকে (বিজিএমইএ) প্রায় ৫০০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর কিছু অংশের সীমানা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। জমির আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরও সম্পন্ন হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীরা অর্থ ব্যয় করে জমি বরাদ্দ পেলেও তাৎক্ষণিকভাবে শিল্প স্থাপনের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, উদ্যোক্তারা জমির মূল্য পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করার পরও অপেক্ষায় রয়েছেন। জমি হস্তান্তর, অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় তারা বিনিয়োগের পরবর্তী ধাপে যেতে পারছেন না।
এ ধরনের বিলম্বের আর্থিক প্রভাবও রয়েছে। কারখানা নির্মাণের প্রস্তুতি, যন্ত্রপাতি আমদানি, অর্থায়ন ও জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা আগে থেকেই করতে হয়। জমি বুঝে পাওয়া বা অবকাঠামো প্রস্তুত হওয়ার সময় পিছিয়ে গেলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন শুরু থেকে আয় আসার সময়ও পিছিয়ে যায়। এতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য মুনাফা কমে এবং নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
ফলে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আগ্রহ থাকলেও তা দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতায় রূপান্তরিত হচ্ছে না। বরাদ্দ দেওয়া জমির বিপরীতে কত দ্রুত কার্যকর শিল্প স্থাপনা গড়ে উঠছে, সেটিই এখন প্রকল্পটির অগ্রগতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
ইউটিলিটি সংকট উৎপাদনেও বাধা
জমি ও অবকাঠামোগত সমস্যার বাইরে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাও অর্থনৈতিক অঞ্চলটির বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্পকারখানায় উৎপাদন চালু রাখার জন্য এসব সেবা অপরিহার্য। সরবরাহে ঘাটতি বা অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাড়ে পরিচালন ব্যয় এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা কমে যায়।
প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে কারখানা স্থাপন করা মডার্ন সিনটেক্সের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক সফল বড়ুয়ার মতে, বড় শিল্পপ্রকল্প লাভজনকভাবে পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পানির চাহিদা মেটাতে এখনো ভূগর্ভস্থ উৎসের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন কঠিন হবে।
অবশ্য ইউটিলিটি অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে বেজা। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিত ৩৮টি পানির পাম্প হাউসের মধ্যে ১৫টি চালু হয়েছে। একটি পানি শোধনাগারও নির্মাণাধীন। ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে এর প্রথম ধাপের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রথম ধাপে দৈনিক ৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৫ কোটি লিটার সরবরাহের সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও সক্ষমতা বাড়ানোর তথ্য দিয়েছে বেজা। অর্থনৈতিক অঞ্চলটির বিদ্যুৎ গ্রিডে ট্রান্সফরমারের মোট সক্ষমতা ২ হাজার ২৮০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার (এমভিএ)। পল্লী বিদ্যুতায়ন এলাকার আওতায় সংযুক্ত বিদ্যুৎ লোড প্রায় ২৩০ মেগাওয়াট, যেখানে সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ৬০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি স্থাপন করেছে তিনটি স্টেশন। এগুলোর মাধ্যমে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
তবে অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকা আর প্রতিটি কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন সেবা পৌঁছে দেওয়া এক বিষয় নয়। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু হলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির চাহিদাও বাড়বে। ফলে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা, সংযোগ এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের অগ্রগতি নয়, বাস্তবে শিল্পকারখানাগুলো কতটা নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাচ্ছে, তারও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
শিল্পাঞ্চল আছে, নেই পূর্ণাঙ্গ নগরসুবিধা
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবস্থানও বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। প্রধান মহাসড়ক থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত এই শিল্পাঞ্চলে পণ্য পরিবহন, শ্রমিক নিয়োগ এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সহায়ক সুবিধা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা এসকিউ ইলেকট্রিক্যালসের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা এহসানুল কবির নিজামীর মতে, কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাতে এলাকাটি নির্জন ও অন্ধকার থাকায় শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কর্মস্থলে যাতায়াত এবং কাজ শেষে নিরাপদে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা না থাকলে শ্রমিকদের আকৃষ্ট করা কঠিন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় সাধারণত উৎপাদন অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রমিকদের যাতায়াত, নিরাপত্তা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা সমান্তরালে গড়ে না উঠলে শিল্পকারখানার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। মিরসরাইয়ের ক্ষেত্রেও শিল্পায়নের সঙ্গে সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের এই সমন্বয় এখনো পূর্ণতা পায়নি।
শ্রমিকদের আবাসনসংকট মোকাবিলায় অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাব-জোন ১৮-তে স্বল্প খরচের আবাসন নির্মাণের কাজ চলছে। তবে শিল্পকারখানার সংখ্যা ও জনবল বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যাপ্ত আবাসন এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক মনে করেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটির বিকাশে ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের পাশাপাশি শ্রমিকদের উপযুক্ত আবাসনের ব্যবস্থা করা গেলে বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ আরও উন্নত হবে।
সহায়ক অবকাঠামোর অন্যান্য কাজেও অগ্রগতি অসম। বেজার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র ও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের নির্মাণকাজ ৮৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। পরিবেশগত পরীক্ষাগারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৯৪ শতাংশ এবং জরুরি সাড়াদান কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ৭২ শতাংশ। এসব অবকাঠামো পুরোপুরি চালু হলে শিল্পাঞ্চলের পরিচালন সক্ষমতা বাড়বে। তবে নির্মাণ শেষ করার পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
এক দরজার সেবা, বাস্তবে কতটা সহজ?
বিনিয়োগকারীদের আরেকটি অভিযোগ সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা নিয়ে। পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন অনুমোদন পেতে একাধিক সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করতে হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। এতে সময় ও ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কারখানা চালুর সময়সূচিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) চালুর উদ্দেশ্যই ছিল বিভিন্ন দপ্তরের সেবা একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজে পাওয়া নিশ্চিত করা। বেজা জানিয়েছে, তাদের অনলাইন পোর্টালে বর্তমানে ৬২ ধরনের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থার সঙ্গে পোর্টালটির সমন্বয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ এখনো চলছে।
তবে অনলাইনে সেবার তালিকা থাকা এবং বাস্তবে নির্ধারিত সময়ে অনুমোদন পাওয়া এক নয়। বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত কত দিন লাগছে, কোন পর্যায়ে ফাইল আটকে থাকছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর। এসব ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণ, আবেদন অনুসরণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর প্রক্রিয়া থাকলে বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি কমানো সম্ভব।
অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে দ্রুত শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে জমি হস্তান্তর, ইউটিলিটি সংযোগ ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। একটি সুবিধা প্রস্তুত হলেও অন্যটি অনুপস্থিত থাকলে কারখানা চালুর পুরো প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে।
নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবায়ও ঘাটতি
শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব শ্রমিকদের কর্মস্থলে যাতায়াতে অনীহা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে উদ্যোক্তাদেরও অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে নজরদারি জোরদার করতে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা সম্ভব হবে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে একটি হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বিকল্প হিসেবে বিদ্যমান এক বা দুটি ভবনকে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন আশিক চৌধুরী।
বড় শিল্পাঞ্চলে জরুরি চিকিৎসা, অগ্নিনির্বাপণ, দুর্ঘটনায় দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কেবল কল্যাণমূলক বিষয় নয়; এগুলো উৎপাদন অব্যাহত রাখারও অংশ। এসব সুবিধা অনুপস্থিত থাকলে দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা, বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি চীনের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানও এখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি নিয়েছে। যথাযথ অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা গেলে অঞ্চলটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলটির সাবেক পরামর্শক আবদুল কাদের খানের মতে, অভ্যন্তরীণ সড়ক, পানি সরবরাহব্যবস্থা, গ্যাস পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ গ্রিডের উন্নয়ন সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এখানে সরাসরি সর্বোচ্চ ১৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রকল্পটিকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রকল্পকে ঘিরে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা কমানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানিসংকট জাতীয় পর্যায়ের সমস্যা হওয়ায় শুধু একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য আলাদা করে এর সমাধান করা কঠিন। কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করলেও সব বিকল্প তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ নেই।
এই বক্তব্য প্রকল্পটির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থনৈতিক অঞ্চলটি কেবল বেজার নিজস্ব অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়; বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সড়ক, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একাধিক সরকারি সংস্থা জড়িত। ফলে একটি দপ্তরের কাজ এগোলেও অন্য দপ্তরের বিলম্বে পুরো প্রকল্পের গতি কমে যেতে পারে।
এ অবস্থায় প্রয়োজন শুধু বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক সমন্বিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা। কোন প্লট কখন হস্তান্তর হবে, কোন এলাকায় কখন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে, পানি সরবরাহের সক্ষমতা কতটা বাড়বে এবং শ্রমিকদের আবাসন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা কখন কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট সময়সূচি থাকা দরকার। একই সঙ্গে বরাদ্দ পাওয়া জমিতে কতটি কারখানা নির্মিত হচ্ছে এবং কতটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যাচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সম্ভাবনাকে বিনিয়োগে রূপ দেওয়ার পরীক্ষা
মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের শিল্পায়ন, রফতানি সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু জমির বিশাল আয়তন, বিনিয়োগের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিজেরাই অর্থনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে উৎপাদন শুরু করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
প্রথমত, বরাদ্দ দেওয়া জমির উন্নয়ন ও হস্তান্তর দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, নিরাপদ যাতায়াত, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় সামাজিক সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে কার্যকর সেবাব্যবস্থায় পরিণত করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকল্পের অগ্রগতি পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু জমি বরাদ্দ কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের হিসাবের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। কতটি কারখানা বাস্তবে চালু হলো, কত বিনিয়োগ উৎপাদনক্ষমতায় রূপ নিল, কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো এবং রফতানি কতটা বাড়ল—এসব সূচককে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এক দশক আগে যে প্রকল্পকে ঘিরে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ও বিপুল রফতানি আয়ের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটিকে এখন পরিকল্পনার পর্যায় থেকে বাস্তব উৎপাদনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই প্রধান কাজ। মিরসরাইয়ের বিশাল শিল্পাঞ্চলের সামনে তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা জমি বা বিনিয়োগের ঘোষণা নয়; বরং প্রতিশ্রুত সম্ভাবনাকে কার্যকর শিল্পায়নে রূপান্তর করা।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশি
অর্থজগত ডেস্ক
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ১২ জনের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩০৯ জন। শনিবার (১০ অক্টোবর) চালানো এ হামলার ঘটনায় বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সব ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি এ হামলার দায় স্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানের জবাব দিতে রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি বাহিনীর হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক। এ ছাড়া বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি দুজনের পরিচয় ও তাঁদের বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
হামলায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, বিপুলসংখ্যক আহত ব্যক্তিকে একসঙ্গে হাসপাতালে নেওয়ায় চিকিৎসাসেবার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
চলতি সপ্তাহে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটি তৃতীয় হামলার ঘটনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বশেষ হামলার পর নিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। সেখানে অবতরণ ও উড্ডয়নের জন্য নির্ধারিত ফ্লাইটগুলো অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
হামলার সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন—এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে জানান, তিনি বিস্ফোরণের ঘটনা দেখেছেন। বিস্ফোরণের পর বিমানবন্দরের ভেতরে কয়েকজনকে আহত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে এক ডজনের বেশি অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত বিমানবন্দরের দিকে ছুটে যায়।
হামলার ঘটনায় হতাহতের পাশাপাশি বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক যোগাযোগকেন্দ্রে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটাতে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা লাগবে – গভর্নর
অর্থজগত প্রতিবেন
ব্যাংক খাতের আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর সরকারকে প্রতিবছর বাজেট থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
শনিবার (১০ অক্টোবর) ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ওয়ান ব্যাংকের আয়োজনে বাংলা কিউআর লেনদেনের প্রচারণা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেখতে পান, ব্যাংক খাতের এক-তৃতীয়াংশ অর্থ চুরি হয়ে গেছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর বাজেট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দিতে হবে।
তিনি বলেন, প্রতিবছর যে ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যয় করতে হবে, সেই অর্থ দিয়ে দুই কোটি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব ছিল। এমনকি এই অর্থ দিয়ে দুটি পদ্মা সেতুও নির্মাণ করা যেত।
ব্যাংক খাত থেকে অর্থ লুটপাটের ঘটনাকে কেবল চুরি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, লুটেরারা জনগণের অর্থ নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে
ভারতের বাজারে বাণিজ্য বাধা দূর করতে বাংলাদেশের জোর
অর্থজগত প্রতিবেদন
ভারতের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও সীমান্তের বিধিনিষেধ, পণ্য প্রবেশে জটিলতা এবং বিভিন্ন অশুল্ক বাধা ব্যবসার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ করা, রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা কাজে লাগাতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে পাটপণ্য ও পেট ফিল্মের ওপর আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও বিদ্যমান শুল্কসুবিধা বহাল রাখার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৬তম সভায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। দুই দিনব্যাপী এই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা নিরসন, স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, পণ্যের মানসংক্রান্ত জটিলতা কমানো এবং আঞ্চলিক পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পেয়েছে। গত ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এ সভায় দুই দেশই বাণিজ্য ও যোগাযোগের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে।
বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিনিষেধ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রফতানিকারকদের পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে স্থলবন্দরভিত্তিক বিধিনিষেধ পর্যালোচনা করে তা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনার জন্য ভারতের কাছে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি শুল্কের বাইরে যেসব প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা পণ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত করে, সেগুলো দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশি পাটপণ্য ও পলিমারভিত্তিক পেট ফিল্মের ওপর ভারতের আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব পণ্যে অতিরিক্ত শুল্কের প্রভাব ভারতীয় বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতাকে কঠিন করে তুলতে পারে। ফলে শুল্ক প্রত্যাহারের উদ্যোগ সফল হলে সংশ্লিষ্ট রফতানি খাতের জন্য বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাজারসুবিধা। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন শর্ত ও প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। এ অবস্থায় ভারতের বাজারে বিদ্যমান শুল্কসুবিধা ধরে রাখা বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ লক্ষ্যে সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া (সাফটা) চুক্তির আওতায় বর্তমানে পাওয়া সুবিধা উত্তরণের পরও অব্যাহত রাখার বিষয়টি আলোচনায় তুলেছে বাংলাদেশ। শুল্কসুবিধা বহাল রাখার পাশাপাশি ভারতীয় বাজারে পণ্য প্রবেশের প্রক্রিয়া সহজ করাও জরুরি। কারণ, কেবল শুল্ক কম থাকলেই রফতানি বাড়ে না; পণ্যের মান যাচাই, সনদ গ্রহণ, কাস্টমস ছাড়পত্র এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়াও ব্যবসার ব্যয় ও সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
এ কারণে পণ্যের মান নির্ধারণে দুই দেশের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা এবং এক দেশের পরীক্ষার ফলাফল বা সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতির বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডসের (বিআইএস) প্রয়োজনীয় সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার প্রস্তাবও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। এ ধরনের জটিলতা কমানো গেলে রফতানিকারকদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি পণ্যের বাজারে প্রবেশের অনিশ্চয়তাও কমতে পারে।
ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়ানোও বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ কৌশলের অংশ। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে নেপাল ও ভুটানে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের সুযোগ সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে এসব দেশে পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথ তৈরি হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সীমান্ত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা কাটানো প্রয়োজন। স্থলবন্দরে প্রবেশপথের সক্ষমতা, ট্রাক রাখার জায়গা, গুদাম, পণ্য সংরক্ষণের শেড এবং পণ্য পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টাইন সুবিধা পর্যাপ্ত না হলে সীমান্তে যানজট ও পণ্য খালাসে বিলম্ব তৈরি হয়। এসব সমস্যা পরিবহন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি পচনশীল পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় ভারতের স্থল কাস্টমস স্টেশনগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। সীমান্তে পণ্য পরিবহন ও খালাসের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ এবং কাস্টমস কার্যক্রমের দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে। স্থলবন্দরগুলোর কার্যক্ষমতা বাড়ানো গেলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা কম সময়ে পণ্য পরিবহন করতে পারবেন, যা সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশের ব্যবসায়ী পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ জোরদার করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এ লক্ষ্যে সিইওস ফোরামকে কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, সম্ভাব্য বিনিয়োগ চিহ্নিত করা এবং বাণিজ্যিক সমস্যার সমাধানে এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। বিশেষ করে তুলার সুতা ও অন্যান্য পণ্য বাংলাদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্থলবন্দরে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহারের বিষয়টি দেশটির আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে বাংলাদেশে পণ্য রফতানির প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আখাউড়া-আগরতলা সংযোগসহ সংশ্লিষ্ট রুটগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত রেল যোগাযোগের উন্নয়ন, বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং সীমান্ত হাটসংক্রান্ত বিষয়গুলোও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে স্থলপথের পাশাপাশি রেল ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য আনা-নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য, বিদ্যমান পরিবহন সংযোগ এবং বড় বাজারের উপস্থিতি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু বাণিজ্য চুক্তি বা শুল্কসুবিধার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সীমান্তে পণ্য চলাচলের বিধিনিষেধ, অশুল্ক বাধা, সনদ গ্রহণের জটিলতা এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর মতো সমস্যাগুলোরও কার্যকর সমাধান প্রয়োজন।
বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখতে বাজারে প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভারতের সঙ্গে আলোচনায় উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশি রফতানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে আলোচনার সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নিয়েছে। দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে স্থলবন্দর ব্যবস্থাপনা, পণ্য পরিবহন ও বাজারে প্রবেশাধিকারের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর অগ্রগতি অর্জিত হলে তা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।
লোকসানের চাপে ডাক বিভাগ, রূপান্তরের পথে ৫ হাজার আউটলেট
অর্থজগত প্রতিবেদন
একসময় মানুষের যোগাযোগের প্রধান ভরসা ছিল ডাকঘর। দূর গ্রামের স্বজনের কাছে চিঠি পাঠানো, মানি-অর্ডারে টাকা পাঠানো কিংবা সরকারি নথি হাতে পাওয়ার জন্য ডাক বিভাগের ওপরই নির্ভর করতে হতো সাধারণ মানুষকে। সময়ের পরিবর্তনে সেই নির্ভরতার জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোন, ডিজিটাল আর্থিক সেবা ও বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান। অথচ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃত ডাক বিভাগের অবকাঠামো এখনো রয়ে গেছে। রয়েছে বিপুলসংখ্যক কর্মী, হাজার হাজার ডাকঘর, বিস্তীর্ণ জমি এবং দেশজুড়ে যোগাযোগের একটি প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ক। কিন্তু এই বিশাল সক্ষমতাকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগিয়ে আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আয় বাড়াতে পারছে না ডাক অধিদপ্তর। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে এবার পুরোনো ডাকঘরকেন্দ্রিক ব্যবস্থাকে আধুনিক লজিস্টিকস ও ই-কমার্স সেবায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এর অংশ হিসেবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজারের বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ডাক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির পেছনে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। বিপরীতে আয় হয়েছে প্রায় ২৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৮৭ কোটি টাকা। এর আগের পাঁচ বছরের আর্থিক চিত্রও একই ধরনের চাপের ইঙ্গিত দেয়। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে ডাক বিভাগের মোট ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ১৮ কোটি টাকা। এ সময়ে আয় হয়েছে ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। ফলে পাঁচ বছরে মোট আর্থিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা।
তবে ডাক বিভাগের এই আর্থিক চিত্রকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি যোগাযোগ, গুরুত্বপূর্ণ নথি বিতরণ, পাসপোর্ট ও বিভিন্ন পরিচয়পত্র পৌঁছে দেওয়া এবং আর্থিক সেবার সুযোগ বিস্তারে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে। বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান যেখানে মূলত লাভজনক রুট ও ব্যবসাকেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, সেখানে ডাক বিভাগকে দেশব্যাপী সেবা বজায় রাখতে হয়। ফলে একদিকে জনসেবার দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় মেটাতে আয় বাড়ানোর প্রয়োজন—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন অধিদপ্তরের বড় চ্যালেঞ্জ।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিকে গতিশীল করা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল চালু করা হচ্ছে। পার্সেল পরিবহন ও বিতরণের পরিমাণ বাড়লে ডাকঘরের আয়ও বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পুরোনো ডাকঘরকে নতুন ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে রূপান্তরের পরিকল্পনা
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত জুলাইয়ে আটটি আউটলেটের মাধ্যমে ফ্র্যাঞ্চাইজি কার্যক্রমের সূচনা হয়। এর মধ্যে চারটি ঢাকায় এবং চারটি ঢাকার বাইরে স্থাপন করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে এই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিজস্ব বিনিয়োগে ডাকসেবা কেন্দ্র পরিচালনা করবেন। চিঠিপত্র ও পার্সেল বুকিং, ই-কমার্সের পণ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং গ্রাহকসেবার মতো কার্যক্রম থাকবে তাঁদের দায়িত্বে। অন্যদিকে ডাক অধিদপ্তর সরবরাহ করবে নিজস্ব নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস সহায়তা।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এসব আউটলেট শুধু চিঠি বা পার্সেল বুকিংয়ের কেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এগুলোকে ই-কমার্স পণ্য সংগ্রহের স্থান, স্থানীয় ডেলিভারি হাব, পেমেন্ট সেন্টার এবং পার্সেল বিতরণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। এতে একদিকে বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে নতুন শাখা স্থাপনে সরকারের সরাসরি বিনিয়োগের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কমতে পারে।
আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজারের বেশি আউটলেট চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ, সেবার মান, পার্সেল পরিবহনের দক্ষতা এবং গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের ওপর। শুধু আউটলেটের সংখ্যা বাড়ালেই আয় বাড়বে না; প্রতিটি কেন্দ্রকে কার্যকর ব্যবসায়িক ইউনিটে পরিণত করতে হবে।
কর্মসংস্থান নিয়েও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর ফলে বর্তমান কর্মীদের চাকরি বহাল থাকবে। স্থায়ী কর্মীদের পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক ডেলিভারিম্যান ও আউটসোর্সিং কর্মীরাও এই কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবেন। অধিদপ্তরের মতে, এতে বিদ্যমান কর্মীবাহিনীকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দেশের অনেক গ্রামীণ ডাকঘর আগে থেকেই খণ্ডকালীন বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এসব কর্মী এক্সট্রা-ডিপার্টমেন্টাল বা ইডি স্টাফ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে স্থায়ী কর্মীদের বড় অংশ সদর দপ্তর, সার্কেল অফিস ও বড় ডাকঘরগুলোতে দায়িত্ব পালন করেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় এই বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সমন্বয় করতে হবে।
বিপুল অবকাঠামো, কিন্তু কাজে লাগছে না পুরো সক্ষমতা
প্রায় ৪০ হাজার কর্মী, ৯ হাজার ৮৪৮টি ডাকঘর এবং প্রায় ৪৩৯ একর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে ডাক অধিদপ্তরের বিশাল নেটওয়ার্ক। দেশের এমন অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় ডাকঘর রয়েছে, যেখানে বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত কিংবা অনুপস্থিত। কিন্তু যোগাযোগপ্রযুক্তির পরিবর্তন এবং চিঠিপত্রের ব্যবহার কমে যাওয়ায় বহু শাখার নিয়মিত কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ভোলার চরফ্যাশনের দুলারহাট ডাকঘরের চিত্র এ সমস্যার একটি উদাহরণ। জরাজীর্ণ ভবনের বাইরে মরিচা ধরা পোস্টবক্স, অথচ ভেতরে চারটি কক্ষের মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র একটি। সেখানে ২৪ বছর ধরে কর্মরত পিয়ন রফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন এ ডাকঘরে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি চিঠি আসে। এসব চিঠির বড় অংশই ব্যাংক, এনজিও ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আইনি নোটিশ।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ ও উপ-ডাকঘরে ভবন, জমি ও জনবল থাকলেও দৈনন্দিন কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। কোথাও চিঠি আদান-প্রদান কমেছে, কোথাও আর্থিক লেনদেনের ধরন বদলেছে, আবার কোথাও পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক কাজ না থাকায় অবকাঠামোর বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে।
অন্যদিকে ই-কমার্সের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য সংগ্রহ, গুদামজাতকরণ, পরিবহন ও গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার বাজার বড় হয়েছে। এই বাজারে বেসরকারি কুরিয়ার ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্যে এ খাতের বাজারের আকার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে ডাক বিভাগের বার্ষিক আয় মাত্র ২৫২ কোটি টাকার মতো।
যদিও দুই অঙ্কের মধ্যে সরাসরি তুলনা করতে হলে সেবার ধরন ও আয়ের হিসাবের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন, তবু ব্যবধানটি ডাক বিভাগের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। ডাক বিভাগের আয় শুধু চিঠি ও পার্সেল পরিবহন থেকে আসে না; সঞ্চয়পত্র, সরকারি ডাকটিকিট এবং দাপ্তরিক চিঠিপত্র-সংক্রান্ত ফিও এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ নতুন বাণিজ্যিক সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ থাকলেও প্রচলিত আয়ের উৎসগুলো প্রত্যাশিত মাত্রায় বিস্তৃত হচ্ছে না।
এই অবস্থায় অব্যবহৃত ডাকঘরগুলোকে স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের পণ্য সংগ্রহ, প্যাকেজিং, বুকিং ও পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে এসব ডাকঘর ব্যবহার করা গেলে বিদ্যমান অবকাঠামো থেকেই নতুন আয়ের পথ তৈরি হতে পারে। তবে সে জন্য শুধু ভবন বা কাউন্টার সচল করাই যথেষ্ট নয়; নির্ভরযোগ্য পরিবহন, সময়মতো পণ্য পৌঁছানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
স্পিড পোস্টে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
প্রথাগত ডাকসেবার বাইরে পার্সেল ব্যবসা সম্প্রসারণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে স্পিড পোস্টকে গুরুত্ব দিচ্ছে অধিদপ্তর। ২০১৮ সালে চালু হওয়া এই সেবা লজিস্টিকস ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। এখন নতুনভাবে সেবাটি সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।
নতুন ব্যবস্থায় ঢাকার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা এবং জেলা শহরগুলোতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ডেলিভারি নিশ্চিত করা গেলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অনলাইন বিক্রেতা এবং ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি পার্সেল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৮৫০ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের মধ্যে সেবাটির ব্যবহারও বাড়ছে। তবে এই পরিমাণকে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে পণ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে শেষ পর্যায়ের ডেলিভারি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, লজিস্টিকস ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে স্পিড পোস্ট আগে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। এখন সেবাটিকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি পার্সেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অধিদপ্তরের বিস্তৃত কার্যক্রমের পরিসরও কম নয়। প্রায় ১৮ হাজার কাউন্টারের মাধ্যমে বছরে আনুমানিক ৫ কোটি ডাকসামগ্রী প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। গত দুই অর্থবছরে প্রায় ৫৬ লাখ পাসপোর্ট, ৭ লাখ মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ান এবং ১৫ লাখ টেলিফোন বিল বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ৭ কোটির বেশি স্মার্ট কার্ড পৌঁছে দিয়েছে ডাক বিভাগ।
এসব কার্যক্রম দেখায়, চিঠিপত্রের ব্যবহার কমলেও গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সরকারি সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের ভূমিকা রয়েছে। এই বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে ই-কমার্স পণ্য বিতরণ যুক্ত করা গেলে একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একাধিক ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব।
ডিজিটাল সেবায় অগ্রগতি, তবু বদলে যাচ্ছে গ্রাহকের চাহিদা
ডাক বিভাগের ব্যবসায়িক মডেলে পরিবর্তনের পেছনে প্রযুক্তিগত রূপান্তরও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক চিঠির ব্যবহার কমেছে। তার জায়গায় বেড়েছে ডিজিটাল যোগাযোগ। একইভাবে মানি-অর্ডারের প্রচলন কমেছে বিকাশ, নগদসহ মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ব্যাংক ট্রান্সফারের বিস্তারের কারণে।
তবে সব ধরনের ডাকসেবায় একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। বাণিজ্যিক চিঠি, সরকারি নথি এবং পার্সেল পরিবহনের চাহিদা এখনো রয়েছে। ডাক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশে পাঠানো ডাকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১৬ টন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৪৩ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ০৪ শতাংশ।
এ প্রবৃদ্ধি ডাক বিভাগের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক ডাকের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিক আর্থিক ঘাটতি কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে সেবাটির ব্যয়, মাশুল ও কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতার ওপর।
প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রায় সব ডাক কার্যক্রম এখন নিজস্ব ডেলিভারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সফটওয়্যারের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ডাকসামগ্রীর অবস্থান শনাক্ত করা এবং বিতরণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ বেড়েছে। গ্রাহকদের কাছে সেবার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পার্সেল ট্র্যাকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দারাজসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ফলে কিছু ডাকঘরে পার্সেল-সংক্রান্ত কাজও আসতে শুরু করেছে। কিন্তু কর্মকর্তাদের মতে, নতুন এই আয়ের উৎসগুলো এখনো পুরো নেটওয়ার্কের সক্ষমতা ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট নয়। কাজের পরিমাণ কম থাকায় কিছু উপ-ডাকঘরে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনও কমে এসেছে।
এখানেই ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রশ্নটি সামনে আসে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা যদি স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহক সংগ্রহ, পণ্য বুকিং ও বিতরণ পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে কম ব্যবহৃত ডাকঘরগুলোকেও নতুন করে সক্রিয় করা সম্ভব। তবে বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণ, সেবার মান এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
আধুনিকায়নে বিনিয়োগ বাড়ছে, ব্যয়ের চাপও বড়
ডাক বিভাগের নেটওয়ার্ককে আধুনিক করতে পরিবহন, ডিজিটাল অবকাঠামো ও ডেলিভারি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। মেইল ভ্যান ও বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের অবস্থান শনাক্ত করতে ভেহিকেল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, রুট ব্যবস্থাপনা এবং পণ্য পৌঁছানোর সময় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
মহাপরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে ৫০০টি ডেস্কটপ কম্পিউটার, ৫০০টি ইউপিএস, ১০টি ল্যাপটপ এবং ৬ হাজার অ্যান্ড্রয়েড ফোন বিতরণ করা হয়েছে। ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের কাছ থেকে পাওয়া ৪৩টি ডেলিভারি ভ্যান ও ৮০টি ইলেকট্রিক বাইকও বহরে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৩৩টি জেলা ডাকঘর নির্মাণ এবং ১০০টি উপজেলা ডাকঘর সংস্কার করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে ই-কমার্স লজিস্টিকস, কোল্ড চেইন সুবিধা, পার্সেল ট্র্যাকিং, দ্রুত হোম ডেলিভারি, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। পাশাপাশি ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থা, অনলাইনে ডাক জীবনবিমা ও সঞ্চয় সেবা, বিল পরিশোধ এবং সরকারি তথ্যসেবা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
বিশেষ করে কোল্ড চেইন সুবিধা চালু করা গেলে দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত আম, জামদানি ও হস্তশিল্প শহরের ক্রেতাদের কাছে কিংবা বিদেশের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের নেটওয়ার্ক সহায়ক হতে পারে। এতে স্থানীয় উৎপাদকদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে এবং ডাক বিভাগের জন্যও বাণিজ্যিক আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।
তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। অথচ সংস্থাটির মোট ব্যয়ের বড় অংশই বেতন ও পেনশন পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে বেতন ও পেনশন খাতে ব্যয় হয়েছে ৮১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৮ শতাংশই গেছে এই দুই খাতে। ফলে প্রযুক্তি উন্নয়ন, পরিবহন সম্প্রসারণ, ভবন সংস্কার ও নতুন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিনিয়োগের জন্য সীমিত অর্থ অবশিষ্ট থাকছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে অতীতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। ২০২১ সালে আগারগাঁওয়ে ৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ডাক অধিদপ্তরের সদর দপ্তর ভবন উদ্বোধন করা হয়। এর আগে ২০১৯ সালে ঢাকায় ডাক বিভাগের কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণে ৩৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এসব বিনিয়োগের পাশাপাশি মূল ডাকসেবার আধুনিকায়ন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর গতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ আধুনিক ভবন, কম্পিউটার কিংবা পরিবহন বাড়ানোই সেবার মান উন্নয়নের শেষ কথা নয়। এগুলোকে কাজে লাগিয়ে কত দ্রুত পার্সেল পৌঁছানো যাচ্ছে, গ্রাহক কত সহজে সেবা পাচ্ছেন এবং প্রতিটি কার্যক্রম থেকে কতটা আয় আসছে—সেই ফলাফলই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জনসেবা ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য জরুরি
ডাক অধিদপ্তরের আর্থিক ঘাটতির পেছনে যেমন প্রথাগত ডাকসেবার সংকোচন রয়েছে, তেমনি রয়েছে এর জনসেবামূলক চরিত্র ও পরিচালন কাঠামোর সীমাবদ্ধতা। বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক এলাকাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী মাশুল নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু ডাক বিভাগকে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সেবা চালু রাখতে হয়। মাশুল পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম মনে করেন, ডাক অধিদপ্তরকে শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যের মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত নয়। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া; মুনাফা অর্জন করা নয়। ডাক মাশুল সামান্য বাড়ানোর ক্ষেত্রেও উচ্চপর্যায়ের সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন হয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এই বাস্তবতা ডাক বিভাগের সংস্কারকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে জনস্বার্থে সাশ্রয়ী সেবা বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ কমাতে আয় বাড়ানোর কার্যকর পথও তৈরি করতে হবে। এ দুই লক্ষ্যকে পরস্পরের বিপরীতে না রেখে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়াই প্রয়োজন।
ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল সেই সমন্বয়ের একটি সম্ভাব্য পথ। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও তদারকির ওপর। উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ, স্বচ্ছ চুক্তি, সেবার মান নির্ধারণ, প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার এবং সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করা না গেলে আউটলেটের সংখ্যা বাড়লেও প্রত্যাশিত আয় নাও আসতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কর্মীদের দায়িত্ব ও নতুন উদ্যোক্তাদের কার্যক্রমের মধ্যে সুস্পষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, ডাক বিভাগের শক্তি শুধু তার ভবন বা কর্মীর সংখ্যা নয়; দেশজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং প্রত্যন্ত এলাকায় মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা। এই সক্ষমতাকে আধুনিক লজিস্টিকস, ই-কমার্স ও ডিজিটাল সেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত সম্পদই নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে সংস্কার বিলম্বিত হলে প্রথাগত ডাকসেবার সংকোচনের সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের ব্যবধান আরও প্রকট হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই ৫ হাজার ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেটের লক্ষ্য পূরণ করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে বিদ্যমান নেটওয়ার্ককে কতটা কার্যকর, গ্রাহকবান্ধব ও আর্থিকভাবে টেকসই করা যাচ্ছে। ডাক বিভাগকে জনসেবার দায়িত্ব বজায় রেখেই নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। সেই রূপান্তর কতটা সফল হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ১১ নতুন ডিএমডি
অর্থজগত প্রতিবেদন
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে বড় পরিবর্তন এনেছে সরকার। মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদ থেকে পদোন্নতি দিয়ে ১১ জন কর্মকর্তাকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে নিয়োগ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদায়ন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন রূপালী ব্যাংক পিএলসির মোহাম্মদ শাহেদুর রহমান, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির মোহাম্মদ ফজলুল করিম, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের আবু সাঈদ মো. রওশনুল হক এবং জনতা ব্যাংক পিএলসির মো. আব্দুল মতিন। তাঁদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ডিএমডি পদে পদায়ন করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক আশরাফুজ্জামান খানকে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ডিএমডি করা হয়েছে। রূপালী ব্যাংকের মো. ইকবাল হোসেন খাঁকে জনতা ব্যাংকে এবং একই ব্যাংকের শিকদার ফারুক এ আজমকে রূপালী ব্যাংকের ডিএমডি পদে পদায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অগ্রণী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক শাহীনূর সুলতানাকে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ডিএমডি করা হয়েছে। বেসিক ব্যাংক পিএলসির মো. হাসান ইমামকে সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ডিএমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের দুই মহাব্যবস্থাপক মো. জামান মোল্লা ও সাফায়েত হোসেন পাটওয়ারীকে একই ব্যাংকের ডিএমডি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত নীতিমালার আওতায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদেশটি জনস্বার্থে জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা পদে এসব নিয়োগের ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ও পরিচালন কাঠামোয় নতুন দায়িত্ব বণ্টন হবে। তবে এ পদোন্নতির ফলে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম, সুশাসন ও সেবার মানে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তা নির্ভর করবে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ওপর।
রমজানে পণ্যের দাম বাড়াতে সিন্ডিকেট চলবে না
অর্থজগত প্রতিবেদন
আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর যেকোনো উদ্যোগ কঠোরভাবে প্রতিহত করার বার্তা দিয়েছে সরকার। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, আমদানি ব্যয় কমানো এবং পরিবহন ব্যবস্থার বাধা দূর করে ভোক্তাদের জন্য সহনীয় দামে পণ্য নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব কথা বলেন। তিনি জানান, রমজান সামনে রেখে যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির প্রক্রিয়ায় রয়েছে, তার পরিমাণ চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত। ফলে পবিত্র মাসে কোনো পণ্যের বড় ধরনের ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু আমদানি বাড়ালেই বাজার স্থিতিশীল থাকবে না; পণ্য আমদানি থেকে শুরু করে পরিবহন, মজুত, পাইকারি ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে হবে। এ কারণে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর যৌক্তিকীকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতা দূর করার বিষয়েও সরকার কাজ করছে।
বিশেষ করে রমজানকেন্দ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের কারসাজি বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর সুযোগ না দেওয়ার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, চাহিদা বাড়ার সময়েও বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য রাখা এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
শুধু রমজান নয়, সারা বছর নিত্যপণ্যের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন ও সরবরাহ পরিকল্পনায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষিপণ্য উৎপাদন করা গেলে বছরের বিভিন্ন সময়ে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে। একই পণ্য যাতে একই সময়ে অতিরিক্ত উৎপাদিত হয়ে পরে সংকট তৈরি না করে, সে বিষয়েও উৎপাদন পরিকল্পনায় সমন্বয় প্রয়োজন।
বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয়কেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছে সরকার। চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে বিদ্যমান বিধিনিষেধের কারণে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের বিষয়টি সভায় উঠে আসে। বিশেষ করে সড়কে ১৩ টন ওজনসীমা নিয়ে ব্যবসায়ীরা আপত্তি জানান। তাদের মতে, এতে একসঙ্গে বেশি পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দামের ওপর চাপ তৈরি করছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বিষয়টি নিয়ে সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। কারণ পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমানো গেলে বাজারে পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান লজিস্টিক জটিলতা কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সভায় চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকেরা সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন। বাজারের প্রধান পণ্যগুলোর আমদানি, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো পণ্যের সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিলে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এ জন্য চেম্বার প্রতি ১৫ দিন পরপর ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করবে। এতে কোন ব্যবসায়ী কী পরিমাণ পণ্য আমদানি করছেন, বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন এবং কোথাও ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে কি না—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হবে।
রমজানের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসেবে ডাল, চাল, ছোলা, গম, সয়াবিন তেল, পাম তেল ও চিনির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীরা সহযোগিতা করবেন বলে সভায় জানানো হয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার দাবি জানানো হয়।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পরিবহনে ১৩ টন ওজনসীমা পুনর্বিবেচনা, বন্দরের লাইটার জাহাজ সংকট ও বিলম্ব দূর করা এবং লাইটার জাহাজের ভাড়া নির্ধারণের বিদ্যমান কাঠামো পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে। তাদের মতে, বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত ও কম খরচে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানো গেলে সরবরাহব্যবস্থার চাপ কমবে এবং এর সুফল বাজারদরেও পড়বে।
অন্যদিকে আমদানিকারক, উৎপাদক ও পরিবেশকদের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থার অসংগতি দূর করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার। কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে কর ও শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এর ফলে আমদানির খরচ কমলে বাজারেও পণ্যের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে রমজান ঘিরে সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে পর্যাপ্ত মজুত, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং যৌক্তিক পরিবহন ব্যয় নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর সুযোগ বন্ধ করতে ব্যবসায়ী ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সভায় চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি হুমায়ুন চৌধুরী, বিজিএমএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান, সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক সহসভাপতি এসএম আবু তৈয়বসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
পানির হিস্যায় বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট
অর্থজগত প্রতিবেদন
ভারতের সঙ্গে নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ন্যায্য পানির অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
হুমায়ুন কবির বলেন, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত কূটনৈতিক কাঠামোকে গুরুত্ব দিয়েই ভারতসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে। বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন ইস্যুতে বাংলাদেশের আগ্রহ ও সদিচ্ছার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে অগ্রগতির বিষয়ে শিগগিরই ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পানিবণ্টনের বিষয়টি শুধু তাৎক্ষণিক কোনো সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ভবিষ্যতের পানি চুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার বিষয়ও যুক্ত। এ কারণে চলমান আলোচনা ভবিষ্যতে বিভিন্ন পানি চুক্তি নবায়ন ও নতুন কাঠামো তৈরির পথ তৈরি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, নদীর পানির হিস্যা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াটি একতরফাভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশকেও সমানভাবে সহযোগিতা ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
সেমিনারে দেশের নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক আইন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বও উঠে আসে। বাংলাদেশের জন্য অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও জনজীবনের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে বিষয়টি নিয়ে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্ব পেতে পারে।

