অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশের রুপালি ইলিশ স্বাদ, গন্ধ ও বৈশিষ্ট্যে বাঙালির রসনার বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। ফলে দাম বেশি হলেও মৌসুমে ইলিশ কিনতে আগ্রহের কমতি থাকে না। ভোক্তার এই আগ্রহকেই কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে আমদানি করা ইলিশসদৃশ মাছকে দেশীয় ইলিশ হিসেবে বাজারজাত করছে। সার্ডিন, চৌক্কা, চন্দনা, চকোরি ও টাকিয়াসহ কয়েক ধরনের মাছকে শুধু ‘আসল ইলিশ’ পরিচয়ে বিক্রি নয়, দেশীয় ইলিশের সঙ্গে মিশিয়ে নদী-সাগর থেকে আসা টাটকা মাছ হিসেবেও বাজারে ছাড়ার অভিযোগ রয়েছে।
কেজিপ্রতি মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে আমদানি করা এসব মাছ ক্রেতার কাছে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দামে। এতে একদিকে যেমন ভোক্তারা আর্থিকভাবে প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশীয় ইলিশের নামে ভিন্ন প্রজাতির মাছ বাজারজাত হওয়ায় তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি।
চট্টগ্রাম মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ (এফআইকিউসি) দপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নিয়মিত হিমায়িত সামুদ্রিক মাছ আমদানি হচ্ছে। এর মধ্যে ইলিশ ও ইলিশের মতো দেখতে মাছও রয়েছে। গত অর্থবছরে প্রায় ৫০০ টন এবং চলতি মাসে ৮৭ টন সার্ডিনসহ কয়েক ধরনের ইলিশসদৃশ মাছ আমদানি হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ৮০ থেকে ৯০ টন এসব মাছ দেশে আসছে। ভারত, মিয়ানমার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মূলত মাছগুলো আমদানি করা হয়। তাঁর মতে, গ্রামের অনেক ক্রেতার পক্ষেও আসল ইলিশ সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমদানি করা হিমায়িত মাছের কিছু চালান দেখতে অনেকটাই ইলিশের মতো। কোনো কোনো মাছের শরীরে রক্তের দাগ থাকায় দূর থেকে সেগুলোকে টাটকা মাছ বলেও মনে হতে পারে। ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের এসব মাছ ঘাট থেকে কেনার পর কোথায় কীভাবে বিক্রি করা হয়, সে বিষয়ে অনেক ব্যবসায়ী সরাসরি কিছু জানেন না। তবে বাজারে এসব মাছের চাহিদা রয়েছে।
ঘাটের এক ব্যবসায়ীর দাবি, সার্ডিন, চন্দনা ও চৌক্কাসহ ইলিশ গোত্রের কিছু মাছ ঘাট থেকে কিনে কোল্ড স্টোরেজে রাখা হয়। পরে ট্রলারে করে সেগুলো গভীর সমুদ্রে নেওয়া হয় এবং সেখানে জেলেদের কাছ থেকে কেনা দেশীয় ইলিশের সঙ্গে মিশিয়ে আবার ঘাটে আনা হয়। এরপর সেগুলো নদী বা সাগর থেকে সদ্য আসা টাটকা মাছ হিসেবে বিক্রির চেষ্টা চলে। ফলে আসল ইলিশের সঙ্গে বিদেশি মাছ মিশিয়ে বিক্রির একটি চক্র গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এভাবে মিশ্রিত মাছের বড় একটি অংশ গ্রামের হাট-বাজারের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয়ও বিক্রি হয়। মাছ কেটে রান্না করার পর কোনটি দেশীয় ইলিশ আর কোনটি ইলিশসদৃশ আমদানি করা মাছ—তা শনাক্ত করা সাধারণ ক্রেতার জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আস্ত মাছের আকৃতি, রং ও গড়ন দেখে অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা কিছুটা পার্থক্য ধরতে পারেন।
চট্টগ্রামের মাছ আমদানিকারক খায়রুল ইসলাম রুমান জানান, ভারত থেকে ইলিশ আমদানি চলতি মাসের ২৩ তারিখ থেকে বন্ধ হয়েছে। এখন মিয়ানমার, ওমানসহ কয়েকটি দেশ থেকে ইলিশের মতো দেখতে বিভিন্ন মাছ আসছে। তিনিও সার্ডিনসহ ইলিশ গোত্রের মাছ আমদানি করছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সার্ডিন প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাঁর দাবি, ডিমওয়ালা দেশীয় ইলিশের সঙ্গে সার্ডিনের বাহ্যিক মিল অনেক বেশি। অন্যদিকে চৌক্কা তুলনামূলক লম্বা হওয়ায় তা ডিমবিহীন লম্বা ইলিশের সঙ্গে সাদৃশ্য তৈরি করে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যেও দেশে সামুদ্রিক মাছ আমদানির বড় বাজারের চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৫২১ কোটি ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকার মাছ আমদানি হয়েছে। হিমায়িত সামুদ্রিক মাছের তালিকায় চান্দা মাছের নাম আলাদাভাবে থাকলেও সার্ডিনসহ ইলিশ গোত্রের বেশ কিছু মাছ ‘অন্যান্য’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
রাজধানীর কাওরান বাজারের মাছ ব্যবসায়ী হিরণ মোল্লা প্রায় তিন দশক ধরে ইলিশ বিক্রি করছেন। তাঁর দাবি, কৌশল ব্যবহার করে মাছের আকৃতিতেও পরিবর্তন আনা সম্ভব। বরফে সংরক্ষণের সময় বিশেষভাবে বাঁধার মাধ্যমে ডিমওয়ালা ইলিশকে কিছুটা লম্বাটে করা যায়। একইভাবে সার্ডিন ও চৌক্কা মাছকেও ইলিশের কাছাকাছি আকৃতি দেওয়া সম্ভব বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করেই কিছু বিদেশি ইলিশসদৃশ মাছকে দেশীয় ইলিশ হিসেবে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ীর মৎস্য আড়তের ব্যবসায়ী বাবুল মিয়ার মতে, সব ক্রেতাই যে প্রতারিত হচ্ছেন, তা নয়। অনেকেই দেখতে ইলিশের মতো আমদানি করা মাছ সম্পর্কে জানেন এবং জেনেশুনেই সেগুলো কেনেন। তবে এসব মাছের শরীরে দেশীয় ইলিশের মতো উজ্জ্বল রুপালি ভাব তুলনামূলক কম; অনেক ক্ষেত্রে কিছুটা লালচে আভাও দেখা যায়। তাঁর মতে, দেশীয় ইলিশের স্বাদেও আগের তুলনায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে আমদানি করা ইলিশসদৃশ মাছের সঙ্গে স্বাদের পার্থক্য সাধারণ ক্রেতার পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব হচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, ইলিশ গোত্রের আমদানি করা মাছ দেশে বিক্রি করা বৈধ হলেও সেগুলোকে অবশ্যই নিজস্ব প্রজাতির নামেই আলাদাভাবে বাজারজাত করতে হবে। দেশীয় ইলিশের সঙ্গে মিশিয়ে ভিন্ন প্রজাতির মাছকে ইলিশ হিসেবে বিক্রি করা গুরুতর অনিয়ম। তাঁর মতে, সাধারণ ক্রেতারা সব সময় মাছের প্রজাতি শনাক্ত করতে পারেন না। তাই বাজারে নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি ভোক্তাদের মাছ চেনার বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদেরও বিভিন্ন মাছের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দেশে ইলিশের চাহিদা ও উচ্চমূল্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই বাজারে মূল সংকট শুধু ভেজাল বা প্রতারণার নয়, পরিচয়ের স্বচ্ছতারও। আমদানি করা মাছ যদি সার্ডিন বা চৌক্কা হিসেবে বিক্রি হয়, ক্রেতা দাম ও মান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু একই মাছকে দেশীয় ইলিশের পরিচয়ে বিক্রি করা হলে সেই সিদ্ধান্তের অধিকারই ক্ষুণ্ন হয়। ফলে ইলিশের বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমদানি করা ইলিশসদৃশ মাছের পৃথক বাজারজাতকরণ, সঠিক নাম ও পরিচয় উল্লেখ এবং নিয়মিত বাজার তদারকি জরুরি।

