সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
Home Blog Page 2

দুই ব্যাংকের লোকসান ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের দুই ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি আরও গভীর হয়েছে। বিপুল পরিমাণ খেলাপি বিনিয়োগ ও ঋণ, আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে ব্যয় বৃদ্ধির চাপে চলতি ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ব্যাংক দুটি সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক দুটির আর্থিক পরিস্থিতিতে এমন বড় অবনতি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জকে নতুন করে সামনে এনেছে।

প্রকাশিত আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের সমন্বিত লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। একই সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক লোকসান করেছে ৩ হাজার ১৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক দুটি শুধু মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হয়নি, বরং তাদের লোকসানের পরিমাণও কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

গত বৃহস্পতিবার ব্যাংক দুটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল অনুমোদন করা হয়। পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী নয় মাসের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করা হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রান্তিক প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।

ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক ফলাফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটি সমন্বিতভাবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। কিন্তু চলতি বছরের একই সময়ে এসে প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে। বিশেষ করে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে একাই লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৯৭০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আয় বাদ দিয়ে এককভাবে হিসাব করলে নয় মাসে ব্যাংকটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

ব্যাংকটির ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে, বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়াই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। অতীতে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কিছু ঋণ ও বিনিয়োগ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে এসব বিনিয়োগের বিপরীতে অর্জিত অর্থ আয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, মেয়াদ শেষে মোট আমানতের পরিমাণ কমলেও আমানতের বিপরীতে মুনাফা ব্যয় বেড়েছে। এতে ব্যাংকটির আয়-ব্যয়ের ব্যবধান আরও প্রকট হয়েছে।

শুধু মুনাফার হিসাবেই নয়, ব্যাংকটির নগদ প্রবাহেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৩৬ টাকা ৫৪ পয়সায় নেমে এসেছে। ব্যাংকটির ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় নগদ প্রবাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মূলধন শক্তিশালী করা, সম্পদের গুণগত মান উন্নয়ন, বিনিয়োগ আদায় বাড়ানো এবং নতুন আমানত সংগ্রহে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।

অন্যদিকে, ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক সংকটও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের ১ হাজার ৪৪৮ কোটি ৪২ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির লোকসান ছিল ২ হাজার ২৮৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ফলে তৃতীয় প্রান্তিকে মাত্র তিন মাসে নতুন করে আরও ৭৩৩ কোটি ৪ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের মতে, খেলাপি হয়ে পড়া কিছু ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে অর্জিত সুদ আয় হিসেবে দেখানো সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি আমানত ও অন্যান্য উৎস থেকে নেওয়া অর্থের বিপরীতে সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। তবে গ্রাহকদের আস্থা কিছুটা ফিরে আসায় আগের বছরের তুলনায় আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমেছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।

ব্যাংকটির সংকটের গভীরতা বোঝা যায় দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের চিত্রে। ২০২২ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে বড় অঙ্কের লোকসান করছে ন্যাশনাল ব্যাংক। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার বছর নয় মাসে ব্যাংকটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯১৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে লোকসান হয়েছে ৮ হাজার ৮৯৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

এদিকে, দীর্ঘদিনের তারল্য সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফেরার চেষ্টা করছে ন্যাশনাল ব্যাংক। গ্রাহকদের আমানত জমা ও উত্তোলন এবং আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এই অর্থ ব্যবহারে কঠোর শর্ত রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক ও বর্তমান পরিচালকদের আমানত ফেরত দেওয়া কিংবা নতুন ঋণ বিতরণে এই তহবিল ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।

সামগ্রিকভাবে ইসলামী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করেছে। তারল্য সহায়তা কিংবা সাময়িক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণ ও বিনিয়োগ আদায়, অনিয়মের দায় নির্ধারণ, মূলধন পুনর্গঠন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। অন্যথায় এসব ব্যাংকের আর্থিক সংকট শুধু শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতির কারণ হবে না, আমানতকারী ও সামগ্রিক ব্যাংক খাতের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করতে পারে।

যুদ্ধের শঙ্কায় ছয় মাসের সর্বোচ্চ দামে তেল

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার উদ্বেগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। এক দিনের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে জ্বালানি মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ার পাশাপাশি ইরানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে—এমন আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সরবরাহ পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে।

সর্বশেষ লেনদেনে ডিসেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৭ দশমিক ৬৪ ডলারে উঠেছে। লেনদেনের একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারের এই প্রধান তেলসূচকের দাম ১১৮ ডলারও ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ১২ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুধু সাম্প্রতিক এক দিনের লেনদেনেই সীমাবদ্ধ নয়। গত অক্টোবর মাসজুড়েই জ্বালানি পণ্যের বাজারে উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। মাস শেষে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দীর্ঘ সময় ধরে তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় রাখছে।

বাজারের অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা বা নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দাবি, এক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী সুপারট্যাংকারকে কেন্দ্র করে চারটি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ইরানি কর্তৃপক্ষের নিষিদ্ধ ঘোষিত পথে চলাচলের সময় দুটি ট্যাংকার মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এসব ঘটনার স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ ধরনের দাবি আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে পরিবহন ব্যয়, বিমা প্রিমিয়াম ও সরবরাহ খরচ বেড়ে যাবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের দামেও পড়তে পারে।

তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতের ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। সংঘাতের বিস্তার এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এলডিসি উত্তরণ পেছাল তিন বছর, প্রস্তুতির বড় পরীক্ষা এখন

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের এতদিনের বিশেষ সুবিধা একসময় আর থাকবে না—এ বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আগে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে আরও তিন বছর। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা পিছিয়ে দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর উত্তরণ ঘটবে বাংলাদেশের। বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা, রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতার মধ্যে এ সিদ্ধান্ত কিছুটা স্বস্তি দিলেও একই সঙ্গে সামনে এনেছে সংস্কার বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সীমিত রপ্তানি পণ্যের পরিসর, উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয়, দুর্বল আর্থিক খাত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে পিছিয়ে থাকার বিষয়গুলো বাংলাদেশের উত্তরণ-প্রস্তুতিকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে বাড়তি তিন বছর শুধু সময়ক্ষেপণের সুযোগ নয়; বরং অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা পুনর্গঠনের শেষ গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২৯ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে উরুগুয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। ব্যতিক্রমী এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় পেল দেশটি। একই অধিবেশনে নেপালের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সময় বাড়ানোর আবেদনটি এসেছে দীর্ঘ পর্যালোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন এবং দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (ইউএন-সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করে সরকার। পরে কমিটি আবেদনটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করে। গত ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদও (ইকোসক) বিষয়টি সাধারণ পরিষদে পাঠায়।

বাংলাদেশের এ উদ্যোগের পেছনে মূল উদ্বেগ ছিল উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধার পরিবর্তন। এলডিসি হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানসহ বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশ অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পেয়ে আসছে। এসব সুবিধা কমে গেলে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্কের চাপ বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান—দুটিই প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প এ পরিবর্তনের বড় চাপে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদনকারী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকলে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে বাণিজ্য সুবিধা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাবে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি প্রায় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। যদিও এটি একটি প্রাক্কলন, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ চিত্র নয়; তবু রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির মাত্রা বোঝাতে যথেষ্ট।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, বাড়তি সময় রপ্তানি খাতের জন্য ইতিবাচক। দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তুতির স্বার্থে উত্তরণের সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন তাঁরা। তাঁর মতে, এ সময়ের মধ্যে অবকাঠামো ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

তবে ব্যবসায়ীদের স্বস্তির পাশাপাশি অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এ সময়ের ব্যবহার। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুনের মতে, উত্তরণের তারিখ পেছালেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর হবে না। বাণিজ্য, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং ও অবকাঠামো খাতে কার্যকর সংস্কার ছাড়া বাড়তি সময়ের সুফল পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে আগেভাগে আলোচনা এবং নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খানও মনে করেন, এ সময়কে বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে লাগানো জরুরি। বিশেষ করে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ এখনো কোনো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে পারেনি। এ অবস্থায় বিদ্যমান বাণিজ্য কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে উত্তরণের পর নানা ধরনের সুবিধা হারানোর ঝুঁকি থেকেই যাবে।

বাংলাদেশের উত্তরণের ইতিহাস অবশ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতিরই প্রতিফলন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে এলডিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর কৃষি, শিল্প, তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং সামাজিক খাতের অগ্রগতির মধ্য দিয়ে দেশটি ধীরে ধীরে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের পর্যালোচনায় মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক—তিনটি মানদণ্ডেই প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ইউএন-সিডিপি উত্তরণের সুপারিশ করে। একই বছরের ৮ জুন ইকোসক এবং ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ তা অনুমোদন করে।

কোভিড-১৯ মহামারির অর্থনৈতিক অভিঘাত বিবেচনায় বাংলাদেশকে প্রচলিত তিন বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর উত্তরণের তারিখ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও প্রস্তুতির ঘাটতি বিবেচনায় নতুন সিদ্ধান্তে তা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়া হলো।

উত্তরণ-পরবর্তী ঝুঁকি শুধু তৈরি পোশাক খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের সম্ভাবনাময় ওষুধশিল্পও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে। এলডিসি হিসেবে আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বিধিমালার আওতায় বাংলাদেশ কিছু বিশেষ ছাড় পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার পরিবর্তন হলে পেটেন্টযুক্ত ওষুধ উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও গবেষণার ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে এ শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির প্রস্তুতি প্রয়োজন।

উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ কিছু বিশেষ অনুদান, সহজ শর্তের ঋণ ও কারিগরি সহায়তা পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব সুযোগের কিছু পরিবর্তিত হতে পারে। যদিও উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে না, তবে ভবিষ্যতে অর্থায়নের জন্য নিজস্ব রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী তিন বছরে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রগতি ছাড়া উত্তরণ-পরবর্তী চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে। প্রথমত, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখা বা বিকল্প সুবিধা নিশ্চিত করতে আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, চামড়া, পাটজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতের রপ্তানি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বন্দর ব্যবস্থাপনা, শুল্ক প্রক্রিয়া, পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহে দক্ষতা বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে।

এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা কমে গেলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান ভিত্তি হবে উৎপাদনশীলতা, পণ্যের গুণগত মান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা।

সিপিডির বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুনের পরামর্শ, বর্ধিত সময়ের জন্য সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। সেখানে প্রতিটি খাতের লক্ষ্য, বাস্তবায়নের সময়সীমা ও অগ্রগতি পরিমাপের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতি ছয় মাস অন্তর সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও প্রকাশের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে স্বস্তির পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এ সুযোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত, সংস্কারের গতি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের বাস্তব উন্নয়নের ওপর। আগামী তিন বছরে যদি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বাণিজ্য কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে, তাহলে ২০২৯ সালের উত্তরণ অনেক বেশি প্রস্তুত অবস্থায় মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। অন্যথায় সময় বাড়লেও অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা কাটবে না, বরং উত্তরণ-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

৩২ কোম্পানির ডিভিডেন্ডে বড় বৈষম্য, শীর্ষে ইউনাইটেড পাওয়ার

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩২টি কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক ফলাফল ও ডিভিডেন্ড ঘোষণায় বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। বাকি ৯টি কোম্পানি কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি। সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় কোম্পানিটির ডিভিডেন্ডের হার কমেছে। অন্যদিকে, লোকসানে থাকা চারটি কোম্পানিও নামমাত্র ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূল্যসংবেদনশীল তথ্য এবং লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সিয়াল পোর্টালে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনায় এসব চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত কোম্পানিগুলোর ঘোষণায় মূলত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক ফলাফল উঠে এসেছে। তবে জিএসপি ফাইন্যান্সের তথ্য ২০২৫ সালের সমাপ্ত অর্থবছরের, যা অন্য কোম্পানিগুলোর তথ্যের সঙ্গে তুলনার ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

ইউনাইটেড পাওয়ার ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য ৬০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে এর পরিমাণ ৬ টাকা। কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ১৫ টাকা ৯৪ পয়সা। আগের অর্থবছরে ৬৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ মুনাফার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য থাকলেও এবার শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ডিভিডেন্ডের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটি।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছে এমজেএল বাংলাদেশ। এ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় ১১ টাকা ৪ পয়সা। তমিজউদ্দিন টেক্সটাইল ১৩ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে; কোম্পানিটির ইপিএস ৪ টাকা ২৯ পয়সা। এই তিন প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ডের হার তুলনামূলক বেশি হলেও বাকি কোম্পানিগুলোর মধ্যে মুনাফা ও ডিভিডেন্ডের অনুপাত এক নয়।

১০ শতাংশ বা তার বেশি ডিভিডেন্ডের তালিকায় রয়েছে আমান ফিড, সামিট পাওয়ার, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, এডিএন টেলিকম, বিডিকম অনলাইন, আরগন ডেনিমস, আমান কটন ও প্রিমিয়ার সিমেন্ট। এর মধ্যে আমান ফিড ও সামিট পাওয়ার ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ করে এবং অন্য কোম্পানিগুলো ১০ শতাংশ করে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের ইপিএস ৮ টাকা ২৬ পয়সা হলেও ডিভিডেন্ডের হার ১০ শতাংশ। বিপরীতে আমান ফিডের ইপিএস মাত্র ২৪ পয়সা, অথচ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোম্পানিটি ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছে।

অন্যদিকে, কয়েকটি কোম্পানি তুলনামূলক কম হারে ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। শাশা ডেনিমস ও সোনারগাঁও টেক্সটাইল ৫ শতাংশ করে, ন্যাশনাল পলিমার ও ইফাদ অটোস ৩ শতাংশ করে, ইভিন্স টেক্সটাইল ও জেএমআই হসপিটাল ২ দশমিক ৫০ শতাংশ করে এবং বিডি অটোকারস ২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া আলহাজ্ব টেক্সটাইল ও গোল্ডেন হার্ভেস্ট ১ শতাংশ করে, বিবিএস কেবলস ও ওরিজা অ্যাগ্রো শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করে এবং ড্রাগণ সোয়েটার শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

তালিকার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, লোকসানে থাকা চারটি কোম্পানিও ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। আলহাজ্ব টেক্সটাইলের শেয়ারপ্রতি লোকসান ২ টাকা ৮৫ পয়সা, গোল্ডেন হার্ভেস্টের ৫৭ পয়সা, বিবিএস কেবলসের ৫ টাকা ৮ পয়সা এবং ড্রাগণ সোয়েটারের ৪৫ পয়সা। লোকসানের মধ্যেও এসব কোম্পানি নামমাত্র ডিভিডেন্ডের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ মানেই কোম্পানির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ক্ষেত্রে নগদ প্রবাহ, সঞ্চিত মুনাফা, ঋণের বোঝা ও পরিচালন আয় বিশ্লেষণ করা জরুরি।

অন্যদিকে, কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি আজিজ পাইপস, জিলবাংলা সুগার, শ্যামপুর সুগার, জিএসপি ফাইন্যান্স, উসমানিয়া গ্লাস, বিবিএস, ইনফরমেশন সার্ভিসেস, জাহিন স্পিনিং ও পেনিনসুলা চিটাগাং। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত ইপিএস ঋণাত্মক। এর মধ্যে জিলবাংলা সুগারের শেয়ারপ্রতি লোকসান ৭২ টাকা ৩২ পয়সা এবং শ্যামপুর সুগারের ৪২ টাকা ৯৪ পয়সা। জিএসপি ফাইন্যান্সের লোকসান ৮ টাকা ৮৯ পয়সা, উসমানিয়া গ্লাসের ৪ টাকা ৭৯ পয়সা এবং আজিজ পাইপসের ৩ টাকা ৭৭ পয়সা।

কোম্পানিগুলোর ঘোষণায় আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ডিভিডেন্ড সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রযোজ্য; স্পনসর ও পরিচালকেরা এর বাইরে রয়েছেন। ফলে ঘোষিত ডিভিডেন্ডের হার দেখার পাশাপাশি কারা এর সুবিধা পাবেন, সেটিও বিনিয়োগকারীদের যাচাই করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ডিভিডেন্ডের এই চিত্রে একদিকে শক্তিশালী মুনাফা করা কোম্পানির উচ্চ ডিভিডেন্ড দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে লোকসান ও দুর্বল আয় থাকা প্রতিষ্ঠানের নামমাত্র ডিভিডেন্ড কিংবা ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্তও সামনে এসেছে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ডিভিডেন্ডের হার নয়, কোম্পানির আয় কতটা টেকসই, নগদ প্রবাহ কেমন, ঋণের পরিমাণ কত এবং বাজারদরের তুলনায় ডিভিডেন্ড থেকে প্রকৃত রিটার্ন কত—এসব বিষয় একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

শেয়ারবাজারে নতুন দিগন্ত, বন্ডে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার অনুমোদন

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়ানো এবং ব্যাংকঋণনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এরই ধারাবাহিকতায় গত পাঁচ মাসে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দিয়েছে পুঁজি বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। অনুমোদিত এসব বন্ডের মধ্যে রয়েছে গ্রিন বন্ড, সাসটেইনেবল সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড এবং প্রচলিত সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড। পাশাপাশি নারী ক্ষমতায়নে অর্থায়নের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বিশেষায়িত ‘অরেঞ্জ বন্ড’। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শেয়ারনির্ভর বাজারকে বহুমুখী করে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থির আয়ের বিকল্প সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত বন্ডগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের এক হাজার কোটি টাকার তিন বছর মেয়াদি জিরো-কুপন গ্রিন বন্ড অন্যতম। এ ছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, ব্যাংক এশিয়ার ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাসটেইনেবল সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড এবং ওয়ান ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড অনুমোদন পেয়েছে।

এসব বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড ব্যাংকের টিয়ার-২ মূলধন বাড়াতে সহায়তা করে, যা ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, গ্রিন ও সাসটেইনেবল বন্ডের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই উন্নয়নসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়।

বন্ড অনুমোদনের পাশাপাশি এর লেনদেনকে গতিশীল করতে সেকেন্ডারি মার্কেট শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। এ লক্ষ্যে অনুমোদিত বন্ডগুলো স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মতে, এর ফলে বিনিয়োগকারীরা তালিকাভুক্ত বন্ড শেয়ার কেনাবেচার মতো স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারবেন। এতে বিনিয়োগের অর্থ নগদায়নের সুযোগ বাড়বে এবং বন্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বন্ডের তালিকাভুক্তি ফি কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানিয়েছেন, দেশের বন্ড মার্কেটকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে এবারই প্রথম অনুমোদিত বন্ডের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বন্ডের লেনদেনের সুযোগ বাড়ানো এবং বাজারে তারল্য নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করছে সংস্থাটি।

বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সাজেদা ফাউন্ডেশনের ১৫৮ কোটি টাকার ‘অরেঞ্জ বন্ড’। নারী ক্ষমতায়ন ও নারীকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের লক্ষ্যে এ বন্ড অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগেও পুঁজি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ডের অর্থ পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণসহ টিয়ার-২ মূলধন সংগ্রহে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিএসইসি এখন বন্ডে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ফান্ড ও পেনশন তহবিলের অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বাইরে করপোরেট বন্ড এবং পুঁজি বাজারের অন্যান্য উপকরণে বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণে নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। একই সঙ্গে বীমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ বন্ডমুখী করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে এসব তহবিলের বড় অংশ তুলনামূলক নিরাপদ ও নির্দিষ্ট আয়ভিত্তিক বিনিয়োগে কেন্দ্রীভূত থাকায় করপোরেট বন্ডে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে বন্ডের চাহিদা ও লেনদেনের গভীরতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগযোগ্য অর্থের নতুন উৎস তৈরি হবে, যা শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকঋণের বিকল্প হিসেবে পুঁজি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করতে পারে।

এ জন্য বন্ড লেনদেনের পৃথক প্ল্যাটফর্ম সক্রিয় করার পাশাপাশি বিদ্যমান ‘ডেট ইস্যু রুলস’ বা বন্ড ইস্যু বিধিমালা আধুনিকায়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিধিমালা সহজ করা গেলে বন্ড ইস্যু ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সময় ও জটিলতা কমবে। একই সঙ্গে তথ্য প্রকাশ, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের পুঁজি বাজার দীর্ঘদিন ধরে শেয়ার লেনদেনের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে বাজারে দরপতন বা অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ পরিস্থিতিতে বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য আর্থিক উপকরণের বিকাশ বাজারের গভীরতা বাড়াতে পারে। তবে শুধু বন্ড অনুমোদন দিলেই এ লক্ষ্য অর্জিত হবে না; নিয়মিত লেনদেন, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, পর্যাপ্ত তারল্য এবং ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করাও জরুরি।

সব মিলিয়ে, বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে বিএসইসির সাম্প্রতিক উদ্যোগ পুঁজি বাজারকে বহুমুখী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে একদিকে ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস পাবে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্যও শেয়ারের বাইরে আয়ভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। তবে উদ্যোগগুলোর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বন্ডের নিয়মিত লেনদেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং বাজারে আস্থা তৈরির ওপর।

জাপানের সঙ্গে ৬ চুক্তি, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলারের ঋণ

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। এসব চুক্তি ও ঋণ সহায়তার মাধ্যমে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের সরকারি জাপান সফরের অর্জন সম্পর্কে এ তথ্য জানিয়েছেন তাঁর উপ প্রেস সচিব শাহাদাত স্বাধীন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এ সফরে যান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

স্বাক্ষরিত ছয়টি সহযোগিতা দলিলের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য অনুদান চুক্তি। এ চুক্তির আওতায় সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেবে জাপান। টহল জাহাজটি উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদার এবং সামুদ্রিক এলাকায় নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

এ ছাড়া দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

কৃষি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এমপ্লয়মেন্ট ফর স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইএসডিপি) নিয়েও একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদারের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও এ বিষয়ে সহযোগিতা বাড়াতে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি আগ্রহপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতিও এসেছে এ সফরে। বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নবিষয়ক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ১৫ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ১০০ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে ৩০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ১৯৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম ও উপজেলা পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দুটি প্রকল্পে জাপানের প্রতিশ্রুত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল সফরে অংশ নেয়।

সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারে জাপানের সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

ডলারের চাপে রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ডলার বিক্রি

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি ও সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা থেকে ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরে এসব ডলার বিক্রি করা হয়। জ্বালানি আমদানির বৈদেশিক মূল্য পরিশোধ, মাসের শেষ দিকে রেমিট্যান্স প্রবাহে তুলনামূলক ধীরগতি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বাড়তি চাহিদা—সব মিলিয়ে ডলারের বাজারে চাপ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে ডলারের মোট চাহিদা ছিল ৮০ কোটি ডলার। বিপুল চাহিদার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরবরাহ করেছে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর মোট চাহিদার তুলনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরবরাহ ছিল সীমিত। এর আগে গত ২০ অক্টোবর প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সে হিসাবে অল্প সময়ের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রির দর বেড়েছে। সর্বশেষ লেনদেনে ডলারের দর ১২৪ টাকা ৩০ পয়সায় পৌঁছানোয় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ব্যাংকারদের তথ্যমতে, বুধবার সকালে রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার কেনার প্রস্তাব পেয়েছিল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কয়েকটি ব্যাংক ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরেও ডলার সংগ্রহ করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার সরবরাহ করার পর রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম দরে ডলার বিক্রির প্রস্তাব দিতে শুরু করে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রভাব বাজারে প্রতিফলিত হওয়ার আভাস পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানান, বুধবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক পেমেন্ট থাকায় বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। বিশেষ করে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিসংক্রান্ত বৈদেশিক দায় পরিশোধের প্রয়োজনীয়তা সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের চাহিদা বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে মাসের শেষ দিকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ তুলনামূলক কমে আসায় চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রিকে বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন ব্যাংকাররা। তাঁদের মতে, বড় অঙ্কের বৈদেশিক পেমেন্টের সময় ব্যাংকগুলোর ডলারের প্রয়োজন বেড়ে যায়। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করলে বাজারে অতিরিক্ত চাপ কমতে পারে। তবে সামনের দিনগুলোতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক পরিশোধ অব্যাহত থাকলে ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে আরও কয়েক দফা হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।

এর আগে মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রির নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে শেষ পর্যন্ত সেদিন রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার বিক্রি করা হয়নি। বুধবার বাজারের চাহিদা ও লেনদেন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করে।

চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে মোট ১৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরের প্রথম ২৭ দিনে দেশে প্রবাসীরা ২৫৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। রেমিট্যান্সের এ প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে সহায়ক হলেও নির্দিষ্ট সময়ে আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধের চাপ বাড়লে বাজারে সাময়িক সংকট তৈরি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শুধু রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করাই যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, রফতানি আয় বাড়ানো এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর কার্যকর নজরদারিও জরুরি। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রি বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা না হলে ডলারের ওপর চাপ আবারও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রিজার্ভ থেকে নিয়মিত ডলার বিক্রির প্রয়োজন দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতির ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

সব মিলিয়ে, ডলারের বাজারে সাম্প্রতিক চাপ বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন করে সতর্কসংকেত দিচ্ছে। সামনে জ্বালানি আমদানি ও অন্যান্য বড় বৈদেশিক পেমেন্টের চাহিদা কীভাবে সামাল দেওয়া হয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কতটা শক্তিশালী থাকে, তার ওপরই ডলারের বাজারের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।

বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩% বাড়ার পূর্বাভাস

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং খাদ্য ও ধাতুর বাজারে অস্থিরতার কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে এ পরিস্থিতিতে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, কৃষ্ণসাগরে শস্য সরবরাহে বাধা এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বৃদ্ধি বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ার প্রধান কারণ। সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। এর ফলে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। তেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চলতি বছর প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ৯২ ডলারে উঠতে পারে। একই সময়ে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ২০২০ সালের বৈশ্বিক মন্দা বাদ দিলে চার দশকের মধ্যে এটি হবে তেলের সরবরাহে সবচেয়ে বড় পতন।
তবে উচ্চমূল্যের কারণে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে তেলের চাহিদা ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। করোনা মহামারিজনিত সংকট এবং ১৯৮০ সালের তেলসংকটের পর এটি হবে চাহিদা কমে যাওয়ার তৃতীয় বৃহত্তম ঘটনা।
খাদ্যপণ্যের বাজারেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশের কিছু বেশি বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে আরও ৭ শতাংশের বেশি মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম মোট প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেকর্ড মাত্রার এল নিনো, কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে নতুন বাধা এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের বিস্তার একসঙ্গে দেখা দিলে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হতে পারে। এতে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওই সময় খাদ্যসংকটের কারণে অতিরিক্ত চার কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষি উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়তে পারে। চলতি বছর সারের দাম ১৪ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যার প্রধান কারণ ইউরিয়ার মূল্যবৃদ্ধি। তবে ২০২৭ সালে সারের দাম আবার ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
এদিকে, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত ধাতুর দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। সরবরাহে বিঘ্নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের চাহিদা বাড়ছে। অন্যদিকে, ভূরাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতে দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে ২০২৭ সালে মূল্যবান ধাতুর দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমার পূর্বাভাস রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসের মতে, একই সময়ে একাধিক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে পণ্যবাজার। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বাণিজ্যে বিঘ্নের প্রভাব মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক চাপ বাড়াতে পারে। সরবরাহে নতুন কোনো ধাক্কা এলে তা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রেও বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৬ সালে পণ্যের দাম বাড়লেও ২০২৭ সালে সামগ্রিকভাবে তা ৭ শতাংশ কমতে পারে। তবে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও সরবরাহসংকট অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রানীতি আরও কঠোর করতে হতে পারে, যা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংঘাতের প্রভাব মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তার উদ্যোগও নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫টি দেশকে স্বল্প সুদের ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা হিসেবে ইতোমধ্যে ৮৭০ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি দেশ সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান কর্মসূচি পুনর্বিন্যাস করেছে এবং ১৯টি দেশ নতুন অর্থায়ন নিয়েছে। কয়েকটি দেশ উভয় ধরনের সহায়তাও পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বৈশ্বিক সংকটের এ সময়ে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পণ্যের উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মূল্যস্ফীতিই বাড়বে না, বরং খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনও আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সূত্র: রয়টার্স ও বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশে জাপানের ৬৩৪ কোটি ডলারের বিনিয়োগ, লক্ষ্য ২ লাখ কর্মসংস্থান

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আগামী পাঁচ বছরে ৬৩৪ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা, বিনিময় হার অনুযায়ী যা পরিবর্তিত হতে পারে। এ বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে অন্তত দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারী শিল্প, গাড়ি উৎপাদন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক লজিস্টিকস খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সরকারি সফরে টোকিওতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও জাপানের শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় আগামী পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েনের বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর, অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন বিনিয়োগের মন্থর গতি, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ, কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ এবং শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয়ের মতো সমস্যার মুখোমুখি, তখন জাপানের এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বাস্তবে কতটা রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে নীতির ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর।
জাপানের বিনিয়োগ পরিকল্পনার গুরুত্ব কেবল অর্থের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির শিল্পপ্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ বাংলাদেশের শিল্পায়নকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। বিশেষ করে অটোমোবাইল, ভারী উৎপাদন শিল্প, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিকে প্রচলিত রফতানিনির্ভর শিল্পের বাইরে বহুমুখী করার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, ভারী উৎপাদন শিল্প, অটোমোবাইল ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে জাপানের বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও দক্ষতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান এবং শিল্পের কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে জমি বরাদ্দ, শিল্প অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, কাস্টমস ছাড়পত্র, কর ব্যবস্থাপনা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা কমাতে হবে। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ঘোষণার পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির সংকটময় সময়ে এ বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা পাওয়া এবং আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারকে দ্রুত সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ স্বাক্ষর। এ চুক্তির লক্ষ্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়ানো এবং শিল্প খাতের বহুমুখীকরণ। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে চুক্তিটি কার্যকর করার বিষয়েও দুই দেশের সরকারপ্রধান অঙ্গীকার করেছেন।
বাংলাদেশের জন্য এ চুক্তির গুরুত্ব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখা এবং নতুন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া দেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। এ পরিস্থিতিতে জাপানের মতো উন্নত অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী হলে রফতানি বাজার সম্প্রসারণ, নতুন পণ্য উৎপাদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষর করলেই বাণিজ্য বাড়বে না। বাংলাদেশি পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদন ব্যয়, সময়মতো সরবরাহ, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করে রফতানি বৈচিত্র্যকরণের পরিকল্পনা প্রয়োজন। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি প্রকৌশল পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাতেও নতুন সুযোগ অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসেপ) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে জাপান। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন ও দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি। বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সহযোগিতার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো অবকাঠামো উন্নয়ন। দুই দেশ তাদের দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বি উদ্যোগকে ‘শেয়ার্ড প্রসপারিটির জন্য বিগ-বি’ কাঠামোয় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও মহেশখালী অঞ্চল। বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্দর সুবিধা, শিল্পাঞ্চল এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি অবকাঠামো সমন্বিতভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য হলো মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস ও উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করা।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ পরিকল্পনার জন্য বড় সুবিধা হতে পারে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বন্দর অবকাঠামো উন্নত হলে আমদানি-রফতানির পরিবহন ব্যয় কমানো, পণ্য খালাস ও সরবরাহের সময় হ্রাস এবং আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এ ধরনের প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে বন্দর থেকে সড়ক ও রেল যোগাযোগ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার ওপর। পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে শুধু জমি ও অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; সেখানে বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের পাশাপাশি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতি এবং রাজধানীতে মেট্রোরেলের নতুন লাইন নির্মাণ ত্বরান্বিত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই দেশের নেতারা। এসব অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়বে এবং নগর অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি এসেছে। জাপানের ‘পার্টনারশিপ অন ওয়াইড এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস রেজিলিয়েন্স এশিয়া’ বা পাওয়ার এশিয়া কাঠামোর আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহায়তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের শিল্পায়নের পথে জ্বালানি সংকট একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির মূল্য ওঠানামা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এ অবস্থায় জাপানের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোর উন্নয়ন করা গেলে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
তবে জরুরি সহায়তা ঋণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে এগোতে হবে। এ জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম দুর্বলতা হলো প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা। এ সমস্যা সমাধানে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রণমূলক বাধা কমানো এবং কাস্টমস, কর, লাইসেন্স প্রদান ও লভ্যাংশ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রম সহজ করা এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করা।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক জাপানকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে গঠনমূলক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য ঘোষিত সংস্কারের দৃশ্যমান বাস্তবায়ন প্রয়োজন। অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে পারে। এ কারণে বিনিয়োগসংক্রান্ত সেবাগুলোকে আরও সমন্বিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
দুই দেশের সহযোগিতা শিল্প ও অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এসব খাতের গুরুত্ব দীর্ঘমেয়াদি। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা, খাদ্য সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে জাপানি অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে উৎপাদনশীলতা ও পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়লে শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করা সহজ হবে।
জাপানি প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাপদ্ধতি থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারণ নয়, বরং দেশীয় সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে তাদের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাও প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগের সুফল বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।
শীর্ষ বৈঠকে মিয়ানমারের মানবিক সংকট, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের নেতারা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে মিয়ানমারে তাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং গৃহীত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন তদারকিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ধরনের কমিশন গঠিত হলে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত চিহ্নিত করা, প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং প্রশাসনিক জটিলতা সমাধানে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শীর্ষ বৈঠকের ঘোষণাগুলোকে কার্যকর কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, ইপিএ, অবকাঠামো প্রকল্প এবং জ্বালানি সহযোগিতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও সময়সীমা প্রয়োজন।
জাপানের এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্পের বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রফতানি সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ইপিএ কার্যকর করা এবং বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে শিল্প ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে রূপান্তর করা গেলে এ সম্ভাবনার পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে ঘোষিত বিনিয়োগের পরিমাণকে তাৎক্ষণিক অর্থপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি। ফলে কোন খাতে কত অর্থ বিনিয়োগ হবে, কত প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, কী পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং স্থানীয় শিল্প কতটা উপকৃত হবে—এসব বিষয় নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই দ্বিমুখী দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা, অন্যদিকে বিনিয়োগের সুফল যেন উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা, রফতানি আয় এবং সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানে প্রতিফলিত হয়, তা নিশ্চিত করা।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতি অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে এ অধ্যায়ের সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণার আকার দিয়ে নয়, বরং প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের বাস্তবায়ন, নতুন শিল্পের বিকাশ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তার পরিমাপযোগ্য অবদান দিয়ে।

দরপতনের বাজারেও ডিভিডেন্ডে বৈচিত্র্য

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
শেয়ারবাজারে টানা দরপতন অব্যাহত থাকলেও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ড ঘোষণা চলছে। বার্ষিক আর্থিক ফলাফল প্রকাশের পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ক্যাশ ও বোনাস ডিভিডেন্ড ঘোষণা করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কোনো কোম্পানি আগের বছরের তুলনায় বেশি ডিভিডেন্ড দিচ্ছে, কোনোটি কমিয়েছে, আবার মুনাফা হ্রাস ও লোকসানের কারণে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ডিভিডেন্ড দিতে পারছে না। এতে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা মূল্যায়নে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে।
চলতি ডিভিডেন্ড মৌসুমে কোম্পানিগুলোর ঘোষণায় আর্থিক অবস্থার ভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা বেড়েছে, তাদের কোনো কোনোটি শেয়ারহোল্ডারদের তুলনামূলক বেশি ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের চাপ, মুনাফা কমে যাওয়া কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে বাড়তি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তায় কিছু কোম্পানি আগের বছরের তুলনায় ডিভিডেন্ড কমিয়েছে। আবার লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কোম্পানিগুলো সাধারণত ক্যাশ ডিভিডেন্ড, বোনাস ডিভিডেন্ড অথবা উভয় ধরনের ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে থাকে। ক্যাশ ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডাররা সরাসরি অর্থ পান। অন্যদিকে, বোনাস ডিভিডেন্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের বিনা মূল্যে অতিরিক্ত শেয়ার দেওয়া হয়। তবে কোন ধরনের ডিভিডেন্ড দেওয়া হবে এবং এর হার কত হবে, তা নির্ধারণে কোম্পানির মুনাফা, নগদ অর্থের প্রাপ্যতা, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিভিডেন্ডের হার দিয়ে কোনো কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা পুরোপুরি বিচার করা যায় না। একটি প্রতিষ্ঠান বেশি ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও তার পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ দুর্বল হলে ভবিষ্যতে একই হারে ডিভিডেন্ড দেওয়া কঠিন হতে পারে। একইভাবে, বোনাস ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে শেয়ারের সংখ্যা বাড়লেও এতে বিনিয়োগকারীর মোট সম্পদের মূল্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পায় না। তাই ডিভিডেন্ড ঘোষণার পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি আয়, নিট মুনাফা, নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ ও নিট সম্পদমূল্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া কোনো কোম্পানি ডিভিডেন্ড কমিয়েছে বা দেয়নি বলেই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়। নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ, ঋণ পরিশোধ কিংবা ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মুনাফার একটি অংশ সংরক্ষণ করতে পারে কোম্পানি। এ কারণে ডিভিডেন্ডের পরিবর্তন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আগের কয়েক বছরের আর্থিক ফলাফল, আয়-ব্যয়ের প্রবণতা এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এদিকে শেয়ারবাজারে দরপতনের কারণে অনেক শেয়ারের বাজারদর কমে যাওয়ায় ডিভিডেন্ড ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের কাছে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে শুধু ডিভিডেন্ডের খবরের ভিত্তিতে শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ঘোষিত ডিভিডেন্ডের হার, বর্তমান বাজারদর, কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয়, রেকর্ড ডেট এবং সংশ্লিষ্ট শেয়ারের ঝুঁকি বিবেচনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, চলমান ডিভিডেন্ড মৌসুম তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাজারের সূচক ও শেয়ারের দামের ওঠানামার পাশাপাশি কোম্পানির আয়, মুনাফা, নগদ প্রবাহ এবং ডিভিডেন্ড দেওয়ার ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে ডিভিডেন্ড ঘোষণা কোনো শেয়ারে নিশ্চিত মুনাফার নিশ্চয়তা নয়; বরং একটি কোম্পানির সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের অন্যতম বিবেচ্য বিষয়।