অর্থজগত প্রতিবেদন
দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপ এবং আমদানি ব্যয়ের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সেই ধারারই প্রতিফলন। বিশেষ করে নভেম্বরের প্রথম দিনেই রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ আগের বছরের একই দিনের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে, যা চলতি অর্থবছরেও প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ১৬৮ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১ হাজার ১৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৪৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
রেমিট্যান্স প্রবাহের এই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নভেম্বরের শুরুতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ এসেছে। ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর দেশে ২২ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অথচ গত বছরের একই দিনে এসেছিল মাত্র ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দিনের হিসাবে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।
অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। রফতানি আয় ও বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সরবরাহ বাড়ায়। এর ফলে আমদানি দায় পরিশোধ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়া যায়।
বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রেমিট্যান্সের অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এলে বৈদেশিক মুদ্রার আনুষ্ঠানিক সরবরাহ বাড়ে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হয়।
তবে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিকে কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির সূচক হিসেবে দেখলে চলবে না। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও এর বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের বড় অংশ পরিবারগুলোর ভোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে, পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের সক্ষমতা তৈরি হয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ অব্যাহত থাকলে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতাও শক্তিশালী হয়। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমাতে আনুষ্ঠানিক পথে প্রবাসী আয় আসার গুরুত্ব তাই ক্রমেই বাড়ছে।
তবে প্রবৃদ্ধির এই ধারা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর সুযোগ আরও সহজ করা, দ্রুত অর্থ স্থানান্তর নিশ্চিত করা এবং প্রবাসীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার বজায় রাখা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বিদেশে নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ কর্মী পাঠানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ রেমিট্যান্সের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সব মিলিয়ে অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রেমিট্যান্সে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে এই প্রবাহকে সাময়িক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা, প্রবাসীদের কল্যাণ এবং জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করাই হবে নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ।


