সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
Home Blog Page 2

শেয়ারবাজারে নতুন দিগন্ত, বন্ডে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার অনুমোদন

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়ানো এবং ব্যাংকঋণনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এরই ধারাবাহিকতায় গত পাঁচ মাসে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দিয়েছে পুঁজি বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। অনুমোদিত এসব বন্ডের মধ্যে রয়েছে গ্রিন বন্ড, সাসটেইনেবল সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড এবং প্রচলিত সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড। পাশাপাশি নারী ক্ষমতায়নে অর্থায়নের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বিশেষায়িত ‘অরেঞ্জ বন্ড’। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শেয়ারনির্ভর বাজারকে বহুমুখী করে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থির আয়ের বিকল্প সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত বন্ডগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের এক হাজার কোটি টাকার তিন বছর মেয়াদি জিরো-কুপন গ্রিন বন্ড অন্যতম। এ ছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, ব্যাংক এশিয়ার ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাসটেইনেবল সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড এবং ওয়ান ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড অনুমোদন পেয়েছে।

এসব বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড ব্যাংকের টিয়ার-২ মূলধন বাড়াতে সহায়তা করে, যা ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, গ্রিন ও সাসটেইনেবল বন্ডের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই উন্নয়নসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়।

বন্ড অনুমোদনের পাশাপাশি এর লেনদেনকে গতিশীল করতে সেকেন্ডারি মার্কেট শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। এ লক্ষ্যে অনুমোদিত বন্ডগুলো স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মতে, এর ফলে বিনিয়োগকারীরা তালিকাভুক্ত বন্ড শেয়ার কেনাবেচার মতো স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারবেন। এতে বিনিয়োগের অর্থ নগদায়নের সুযোগ বাড়বে এবং বন্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বন্ডের তালিকাভুক্তি ফি কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানিয়েছেন, দেশের বন্ড মার্কেটকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে এবারই প্রথম অনুমোদিত বন্ডের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বন্ডের লেনদেনের সুযোগ বাড়ানো এবং বাজারে তারল্য নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করছে সংস্থাটি।

বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সাজেদা ফাউন্ডেশনের ১৫৮ কোটি টাকার ‘অরেঞ্জ বন্ড’। নারী ক্ষমতায়ন ও নারীকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের লক্ষ্যে এ বন্ড অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগেও পুঁজি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ডের অর্থ পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণসহ টিয়ার-২ মূলধন সংগ্রহে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিএসইসি এখন বন্ডে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ফান্ড ও পেনশন তহবিলের অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বাইরে করপোরেট বন্ড এবং পুঁজি বাজারের অন্যান্য উপকরণে বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণে নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। একই সঙ্গে বীমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ বন্ডমুখী করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে এসব তহবিলের বড় অংশ তুলনামূলক নিরাপদ ও নির্দিষ্ট আয়ভিত্তিক বিনিয়োগে কেন্দ্রীভূত থাকায় করপোরেট বন্ডে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে বন্ডের চাহিদা ও লেনদেনের গভীরতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগযোগ্য অর্থের নতুন উৎস তৈরি হবে, যা শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকঋণের বিকল্প হিসেবে পুঁজি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করতে পারে।

এ জন্য বন্ড লেনদেনের পৃথক প্ল্যাটফর্ম সক্রিয় করার পাশাপাশি বিদ্যমান ‘ডেট ইস্যু রুলস’ বা বন্ড ইস্যু বিধিমালা আধুনিকায়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিধিমালা সহজ করা গেলে বন্ড ইস্যু ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সময় ও জটিলতা কমবে। একই সঙ্গে তথ্য প্রকাশ, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের পুঁজি বাজার দীর্ঘদিন ধরে শেয়ার লেনদেনের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে বাজারে দরপতন বা অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ পরিস্থিতিতে বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য আর্থিক উপকরণের বিকাশ বাজারের গভীরতা বাড়াতে পারে। তবে শুধু বন্ড অনুমোদন দিলেই এ লক্ষ্য অর্জিত হবে না; নিয়মিত লেনদেন, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, পর্যাপ্ত তারল্য এবং ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করাও জরুরি।

সব মিলিয়ে, বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে বিএসইসির সাম্প্রতিক উদ্যোগ পুঁজি বাজারকে বহুমুখী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে একদিকে ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস পাবে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্যও শেয়ারের বাইরে আয়ভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। তবে উদ্যোগগুলোর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বন্ডের নিয়মিত লেনদেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং বাজারে আস্থা তৈরির ওপর।

জাপানের সঙ্গে ৬ চুক্তি, ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলারের ঋণ

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। এসব চুক্তি ও ঋণ সহায়তার মাধ্যমে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের সরকারি জাপান সফরের অর্জন সম্পর্কে এ তথ্য জানিয়েছেন তাঁর উপ প্রেস সচিব শাহাদাত স্বাধীন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এ সফরে যান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

স্বাক্ষরিত ছয়টি সহযোগিতা দলিলের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য অনুদান চুক্তি। এ চুক্তির আওতায় সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেবে জাপান। টহল জাহাজটি উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদার এবং সামুদ্রিক এলাকায় নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

এ ছাড়া দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

কৃষি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এমপ্লয়মেন্ট ফর স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইএসডিপি) নিয়েও একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদারের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও এ বিষয়ে সহযোগিতা বাড়াতে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি আগ্রহপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতিও এসেছে এ সফরে। বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নবিষয়ক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ১৫ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ১০০ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে ৩০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ১৯৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম ও উপজেলা পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দুটি প্রকল্পে জাপানের প্রতিশ্রুত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল সফরে অংশ নেয়।

সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারে জাপানের সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

ডলারের চাপে রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ডলার বিক্রি

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি ও সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা থেকে ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরে এসব ডলার বিক্রি করা হয়। জ্বালানি আমদানির বৈদেশিক মূল্য পরিশোধ, মাসের শেষ দিকে রেমিট্যান্স প্রবাহে তুলনামূলক ধীরগতি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বাড়তি চাহিদা—সব মিলিয়ে ডলারের বাজারে চাপ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে ডলারের মোট চাহিদা ছিল ৮০ কোটি ডলার। বিপুল চাহিদার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরবরাহ করেছে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর মোট চাহিদার তুলনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরবরাহ ছিল সীমিত। এর আগে গত ২০ অক্টোবর প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সে হিসাবে অল্প সময়ের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রির দর বেড়েছে। সর্বশেষ লেনদেনে ডলারের দর ১২৪ টাকা ৩০ পয়সায় পৌঁছানোয় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ব্যাংকারদের তথ্যমতে, বুধবার সকালে রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার কেনার প্রস্তাব পেয়েছিল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কয়েকটি ব্যাংক ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরেও ডলার সংগ্রহ করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার সরবরাহ করার পর রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম দরে ডলার বিক্রির প্রস্তাব দিতে শুরু করে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রভাব বাজারে প্রতিফলিত হওয়ার আভাস পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানান, বুধবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক পেমেন্ট থাকায় বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। বিশেষ করে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিসংক্রান্ত বৈদেশিক দায় পরিশোধের প্রয়োজনীয়তা সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের চাহিদা বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে মাসের শেষ দিকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ তুলনামূলক কমে আসায় চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রিকে বাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন ব্যাংকাররা। তাঁদের মতে, বড় অঙ্কের বৈদেশিক পেমেন্টের সময় ব্যাংকগুলোর ডলারের প্রয়োজন বেড়ে যায়। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করলে বাজারে অতিরিক্ত চাপ কমতে পারে। তবে সামনের দিনগুলোতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক পরিশোধ অব্যাহত থাকলে ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে আরও কয়েক দফা হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।

এর আগে মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রির নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে শেষ পর্যন্ত সেদিন রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার বিক্রি করা হয়নি। বুধবার বাজারের চাহিদা ও লেনদেন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করে।

চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে মোট ১৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরের প্রথম ২৭ দিনে দেশে প্রবাসীরা ২৫৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। রেমিট্যান্সের এ প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে সহায়ক হলেও নির্দিষ্ট সময়ে আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধের চাপ বাড়লে বাজারে সাময়িক সংকট তৈরি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শুধু রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করাই যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, রফতানি আয় বাড়ানো এবং আমদানি ব্যয়ের ওপর কার্যকর নজরদারিও জরুরি। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রি বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা না হলে ডলারের ওপর চাপ আবারও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রিজার্ভ থেকে নিয়মিত ডলার বিক্রির প্রয়োজন দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতির ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

সব মিলিয়ে, ডলারের বাজারে সাম্প্রতিক চাপ বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন করে সতর্কসংকেত দিচ্ছে। সামনে জ্বালানি আমদানি ও অন্যান্য বড় বৈদেশিক পেমেন্টের চাহিদা কীভাবে সামাল দেওয়া হয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কতটা শক্তিশালী থাকে, তার ওপরই ডলারের বাজারের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।

বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩% বাড়ার পূর্বাভাস

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং খাদ্য ও ধাতুর বাজারে অস্থিরতার কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে এ পরিস্থিতিতে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, কৃষ্ণসাগরে শস্য সরবরাহে বাধা এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বৃদ্ধি বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ার প্রধান কারণ। সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। এর ফলে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। তেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চলতি বছর প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ৯২ ডলারে উঠতে পারে। একই সময়ে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ২০২০ সালের বৈশ্বিক মন্দা বাদ দিলে চার দশকের মধ্যে এটি হবে তেলের সরবরাহে সবচেয়ে বড় পতন।
তবে উচ্চমূল্যের কারণে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে তেলের চাহিদা ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। করোনা মহামারিজনিত সংকট এবং ১৯৮০ সালের তেলসংকটের পর এটি হবে চাহিদা কমে যাওয়ার তৃতীয় বৃহত্তম ঘটনা।
খাদ্যপণ্যের বাজারেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশের কিছু বেশি বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে আরও ৭ শতাংশের বেশি মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম মোট প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেকর্ড মাত্রার এল নিনো, কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে নতুন বাধা এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের বিস্তার একসঙ্গে দেখা দিলে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হতে পারে। এতে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওই সময় খাদ্যসংকটের কারণে অতিরিক্ত চার কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষি উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়তে পারে। চলতি বছর সারের দাম ১৪ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যার প্রধান কারণ ইউরিয়ার মূল্যবৃদ্ধি। তবে ২০২৭ সালে সারের দাম আবার ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
এদিকে, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত ধাতুর দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। সরবরাহে বিঘ্নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের চাহিদা বাড়ছে। অন্যদিকে, ভূরাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতে দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে ২০২৭ সালে মূল্যবান ধাতুর দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমার পূর্বাভাস রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসের মতে, একই সময়ে একাধিক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে পণ্যবাজার। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বাণিজ্যে বিঘ্নের প্রভাব মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক চাপ বাড়াতে পারে। সরবরাহে নতুন কোনো ধাক্কা এলে তা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রেও বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৬ সালে পণ্যের দাম বাড়লেও ২০২৭ সালে সামগ্রিকভাবে তা ৭ শতাংশ কমতে পারে। তবে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও সরবরাহসংকট অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রানীতি আরও কঠোর করতে হতে পারে, যা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংঘাতের প্রভাব মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তার উদ্যোগও নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫টি দেশকে স্বল্প সুদের ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা হিসেবে ইতোমধ্যে ৮৭০ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি দেশ সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান কর্মসূচি পুনর্বিন্যাস করেছে এবং ১৯টি দেশ নতুন অর্থায়ন নিয়েছে। কয়েকটি দেশ উভয় ধরনের সহায়তাও পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বৈশ্বিক সংকটের এ সময়ে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পণ্যের উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মূল্যস্ফীতিই বাড়বে না, বরং খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনও আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

সূত্র: রয়টার্স ও বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশে জাপানের ৬৩৪ কোটি ডলারের বিনিয়োগ, লক্ষ্য ২ লাখ কর্মসংস্থান

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আগামী পাঁচ বছরে ৬৩৪ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা, বিনিময় হার অনুযায়ী যা পরিবর্তিত হতে পারে। এ বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে অন্তত দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারী শিল্প, গাড়ি উৎপাদন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক লজিস্টিকস খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সরকারি সফরে টোকিওতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও জাপানের শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় আগামী পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েনের বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর, অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন বিনিয়োগের মন্থর গতি, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ, কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ এবং শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয়ের মতো সমস্যার মুখোমুখি, তখন জাপানের এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বাস্তবে কতটা রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে নীতির ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর।
জাপানের বিনিয়োগ পরিকল্পনার গুরুত্ব কেবল অর্থের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির শিল্পপ্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ বাংলাদেশের শিল্পায়নকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। বিশেষ করে অটোমোবাইল, ভারী উৎপাদন শিল্প, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিকে প্রচলিত রফতানিনির্ভর শিল্পের বাইরে বহুমুখী করার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, ভারী উৎপাদন শিল্প, অটোমোবাইল ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে জাপানের বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও দক্ষতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান এবং শিল্পের কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে জমি বরাদ্দ, শিল্প অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, কাস্টমস ছাড়পত্র, কর ব্যবস্থাপনা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা কমাতে হবে। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ঘোষণার পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির সংকটময় সময়ে এ বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা পাওয়া এবং আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারকে দ্রুত সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ স্বাক্ষর। এ চুক্তির লক্ষ্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়ানো এবং শিল্প খাতের বহুমুখীকরণ। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে চুক্তিটি কার্যকর করার বিষয়েও দুই দেশের সরকারপ্রধান অঙ্গীকার করেছেন।
বাংলাদেশের জন্য এ চুক্তির গুরুত্ব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখা এবং নতুন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া দেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। এ পরিস্থিতিতে জাপানের মতো উন্নত অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী হলে রফতানি বাজার সম্প্রসারণ, নতুন পণ্য উৎপাদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষর করলেই বাণিজ্য বাড়বে না। বাংলাদেশি পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদন ব্যয়, সময়মতো সরবরাহ, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করে রফতানি বৈচিত্র্যকরণের পরিকল্পনা প্রয়োজন। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি প্রকৌশল পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাতেও নতুন সুযোগ অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসেপ) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে জাপান। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন ও দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি। বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সহযোগিতার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো অবকাঠামো উন্নয়ন। দুই দেশ তাদের দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বি উদ্যোগকে ‘শেয়ার্ড প্রসপারিটির জন্য বিগ-বি’ কাঠামোয় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও মহেশখালী অঞ্চল। বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্দর সুবিধা, শিল্পাঞ্চল এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি অবকাঠামো সমন্বিতভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য হলো মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস ও উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করা।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ পরিকল্পনার জন্য বড় সুবিধা হতে পারে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বন্দর অবকাঠামো উন্নত হলে আমদানি-রফতানির পরিবহন ব্যয় কমানো, পণ্য খালাস ও সরবরাহের সময় হ্রাস এবং আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এ ধরনের প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে বন্দর থেকে সড়ক ও রেল যোগাযোগ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার ওপর। পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে শুধু জমি ও অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; সেখানে বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের পাশাপাশি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতি এবং রাজধানীতে মেট্রোরেলের নতুন লাইন নির্মাণ ত্বরান্বিত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই দেশের নেতারা। এসব অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়বে এবং নগর অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি এসেছে। জাপানের ‘পার্টনারশিপ অন ওয়াইড এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস রেজিলিয়েন্স এশিয়া’ বা পাওয়ার এশিয়া কাঠামোর আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহায়তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের শিল্পায়নের পথে জ্বালানি সংকট একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির মূল্য ওঠানামা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এ অবস্থায় জাপানের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোর উন্নয়ন করা গেলে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
তবে জরুরি সহায়তা ঋণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে এগোতে হবে। এ জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম দুর্বলতা হলো প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা। এ সমস্যা সমাধানে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রণমূলক বাধা কমানো এবং কাস্টমস, কর, লাইসেন্স প্রদান ও লভ্যাংশ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রম সহজ করা এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করা।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক জাপানকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে গঠনমূলক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য ঘোষিত সংস্কারের দৃশ্যমান বাস্তবায়ন প্রয়োজন। অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে পারে। এ কারণে বিনিয়োগসংক্রান্ত সেবাগুলোকে আরও সমন্বিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
দুই দেশের সহযোগিতা শিল্প ও অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এসব খাতের গুরুত্ব দীর্ঘমেয়াদি। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা, খাদ্য সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে জাপানি অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে উৎপাদনশীলতা ও পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়লে শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করা সহজ হবে।
জাপানি প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাপদ্ধতি থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারণ নয়, বরং দেশীয় সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে তাদের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাও প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগের সুফল বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।
শীর্ষ বৈঠকে মিয়ানমারের মানবিক সংকট, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের নেতারা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে মিয়ানমারে তাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং গৃহীত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন তদারকিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ধরনের কমিশন গঠিত হলে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত চিহ্নিত করা, প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং প্রশাসনিক জটিলতা সমাধানে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শীর্ষ বৈঠকের ঘোষণাগুলোকে কার্যকর কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, ইপিএ, অবকাঠামো প্রকল্প এবং জ্বালানি সহযোগিতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও সময়সীমা প্রয়োজন।
জাপানের এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্পের বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রফতানি সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ইপিএ কার্যকর করা এবং বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে শিল্প ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে রূপান্তর করা গেলে এ সম্ভাবনার পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে ঘোষিত বিনিয়োগের পরিমাণকে তাৎক্ষণিক অর্থপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি। ফলে কোন খাতে কত অর্থ বিনিয়োগ হবে, কত প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, কী পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং স্থানীয় শিল্প কতটা উপকৃত হবে—এসব বিষয় নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই দ্বিমুখী দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা, অন্যদিকে বিনিয়োগের সুফল যেন উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা, রফতানি আয় এবং সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানে প্রতিফলিত হয়, তা নিশ্চিত করা।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতি অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে এ অধ্যায়ের সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণার আকার দিয়ে নয়, বরং প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের বাস্তবায়ন, নতুন শিল্পের বিকাশ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তার পরিমাপযোগ্য অবদান দিয়ে।

দরপতনের বাজারেও ডিভিডেন্ডে বৈচিত্র্য

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
শেয়ারবাজারে টানা দরপতন অব্যাহত থাকলেও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ড ঘোষণা চলছে। বার্ষিক আর্থিক ফলাফল প্রকাশের পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ক্যাশ ও বোনাস ডিভিডেন্ড ঘোষণা করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কোনো কোম্পানি আগের বছরের তুলনায় বেশি ডিভিডেন্ড দিচ্ছে, কোনোটি কমিয়েছে, আবার মুনাফা হ্রাস ও লোকসানের কারণে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ডিভিডেন্ড দিতে পারছে না। এতে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা মূল্যায়নে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে।
চলতি ডিভিডেন্ড মৌসুমে কোম্পানিগুলোর ঘোষণায় আর্থিক অবস্থার ভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা বেড়েছে, তাদের কোনো কোনোটি শেয়ারহোল্ডারদের তুলনামূলক বেশি ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের চাপ, মুনাফা কমে যাওয়া কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে বাড়তি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তায় কিছু কোম্পানি আগের বছরের তুলনায় ডিভিডেন্ড কমিয়েছে। আবার লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কোম্পানিগুলো সাধারণত ক্যাশ ডিভিডেন্ড, বোনাস ডিভিডেন্ড অথবা উভয় ধরনের ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে থাকে। ক্যাশ ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডাররা সরাসরি অর্থ পান। অন্যদিকে, বোনাস ডিভিডেন্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের বিনা মূল্যে অতিরিক্ত শেয়ার দেওয়া হয়। তবে কোন ধরনের ডিভিডেন্ড দেওয়া হবে এবং এর হার কত হবে, তা নির্ধারণে কোম্পানির মুনাফা, নগদ অর্থের প্রাপ্যতা, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিভিডেন্ডের হার দিয়ে কোনো কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা পুরোপুরি বিচার করা যায় না। একটি প্রতিষ্ঠান বেশি ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও তার পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ দুর্বল হলে ভবিষ্যতে একই হারে ডিভিডেন্ড দেওয়া কঠিন হতে পারে। একইভাবে, বোনাস ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে শেয়ারের সংখ্যা বাড়লেও এতে বিনিয়োগকারীর মোট সম্পদের মূল্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পায় না। তাই ডিভিডেন্ড ঘোষণার পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি আয়, নিট মুনাফা, নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ ও নিট সম্পদমূল্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া কোনো কোম্পানি ডিভিডেন্ড কমিয়েছে বা দেয়নি বলেই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়। নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ, ঋণ পরিশোধ কিংবা ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মুনাফার একটি অংশ সংরক্ষণ করতে পারে কোম্পানি। এ কারণে ডিভিডেন্ডের পরিবর্তন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আগের কয়েক বছরের আর্থিক ফলাফল, আয়-ব্যয়ের প্রবণতা এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এদিকে শেয়ারবাজারে দরপতনের কারণে অনেক শেয়ারের বাজারদর কমে যাওয়ায় ডিভিডেন্ড ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের কাছে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে শুধু ডিভিডেন্ডের খবরের ভিত্তিতে শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ঘোষিত ডিভিডেন্ডের হার, বর্তমান বাজারদর, কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয়, রেকর্ড ডেট এবং সংশ্লিষ্ট শেয়ারের ঝুঁকি বিবেচনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, চলমান ডিভিডেন্ড মৌসুম তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাজারের সূচক ও শেয়ারের দামের ওঠানামার পাশাপাশি কোম্পানির আয়, মুনাফা, নগদ প্রবাহ এবং ডিভিডেন্ড দেওয়ার ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে ডিভিডেন্ড ঘোষণা কোনো শেয়ারে নিশ্চিত মুনাফার নিশ্চয়তা নয়; বরং একটি কোম্পানির সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের অন্যতম বিবেচ্য বিষয়।

রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
পবিত্র রমজান সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং ফল আমদানিতে করব্যবস্থা সহজ করার দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকেরা। তবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। খেজুরের শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাবটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা করে বিবেচনা করা হবে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি প্রস্তুতি, সরবরাহ পরিস্থিতি ও মূল্য পর্যালোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে পণ্য পরিবহন জটিল হয়ে পড়েছে। বিকল্প পথে আমদানি করতে গিয়ে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা অব্যাহত থাকলে বাজারে পণ্য সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।
আমদানিকারকদের হিসাবে, খেজুর আমদানিতে বর্তমানে প্রায় ৫৫ শতাংশ শুল্ক ও কর দিতে হয়। এর সঙ্গে উচ্চ শুল্কায়নমূল্য ও পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, খেজুরের প্রকৃত মান ও বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে শুল্ক নির্ধারণ করা হলে আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আমদানি হয়। ফলে সব ধরনের খেজুরের জন্য একই শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। জাত, মান ও দামের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ছাড়ের সুবিধা দ্রুত কার্যকরের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
রমজানের পণ্য আমদানি বেড়েছে
বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার টন। এ সময়ে ভোজ্যতেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ৫ হাজার টনের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি।
একই সময়ে চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৫৩ হাজার টন বেশি। চিনি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার টনের।
রমজানে ইফতারের অন্যতম প্রধান উপকরণ ছোলার আমদানিতে আরও বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছোলা আমদানি হয়েছে ৮২ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল মাত্র ১২ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার টন। এ সময়ে ছোলা আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টনের।
এ ছাড়া মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪ হাজার টন বেশি। মসুর ডাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার টনের। অন্যদিকে খেজুর আমদানি হয়েছে ১১ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের ৪ হাজার টনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
ছোট ডাল মিল নিয়ে উদ্বেগ
রমজানে ছোলা ও মসুর ডালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দাম স্থিতিশীল রাখতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে বড় ব্যবসায়ীদের প্রভাবের কারণে ছোট ডাল মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী নেসার উদ্দিন জানান, দেশে ছোলার চাহিদা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। অন্যদিকে মসুর ডালের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করে পূরণ করতে হয়। বড় ব্যবসায়ীদের কারণে সাধারণ ডাল মিলগুলোর ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সমস্যা সমাধানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে কোনো শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকভাবে সমন্বয় করা গেলে বাজারে দাম সহনীয় রাখতে সহায়তা হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও মসুর ডালের দাম কমেছে বলে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
ডিম-মুরগির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার আশা
বৈঠকে পোল্ট্রি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, দেশে ডিম ও মুরগির উৎপাদন পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। খামার পর্যায়ে ডিমের দাম কিছুদিন আগের প্রতিটি সাড়ে ১১ টাকা থেকে কমে ১০ টাকার নিচে নেমেছে, যা উৎপাদন খরচের কাছাকাছি। খামারগুলোতে রোগবালাইয়ের উল্লেখযোগ্য প্রাদুর্ভাব না থাকায় উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা করছেন না তারা।
তবে রমজানে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে ডিমের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। ঈদের পর মুরগির চাহিদা বাড়লে বাজারদরেও প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিদ্যমান আমদানি নীতি অনুযায়ী, সরকারের বিশেষ অনুমতি ছাড়া ডিম ও মাংস আমদানি করা যায় না।
রমজানে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, খেজুর, মুরগি ও ডিমের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে ইফতারসামগ্রী তৈরিতে ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এ কারণে আগাম আমদানি, পর্যাপ্ত মজুত ও নির্বিঘ্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছে সরকার।
বৈঠকে ব্যবসায়ীদের সময়মতো পণ্য আমদানি এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানানো হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে সরকার। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠন, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, এনবিআর, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানিতে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর কাছে উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের নির্ভরযোগ্য উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে। সাধারণ টি-শার্ট, শার্ট ও ট্রাউজারের মতো মৌলিক পোশাকের পাশাপাশি এখন জ্যাকেট, স্যুট, ব্লেজার, বিয়ের পোশাক এবং টেকনিক্যাল অ্যাপারেল তৈরি করছেন দেশের রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো। গত কয়েক বছরে বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কার্যাদেশ বৃদ্ধি পাওয়ায় পোশাকশিল্পের এ নতুন সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একসময় কম দামের পোশাকের উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন প্রিমিয়াম পণ্যের বাজারেও অবস্থান শক্ত করছে। জার্মানির উচ্চমূল্যের পোশাকের ব্র্যান্ড হারকো গত ছয় মাস ধরে টিম গ্রুপের একটি কারখানায় পোশাক তৈরি করছে। একই সময়ে ডেনমার্কের বেস্টসেলার গ্রুপের মালিকানাধীন স্পেনভিত্তিক ব্র্যান্ড বালমোহকও বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় কারখানায় বটম প্যান্টসহ বিভিন্ন পণ্যের কার্যাদেশ দিয়েছে।
শুধু নতুন ব্র্যান্ড নয়, আগে থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা করছে—এমন আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও উচ্চমূল্যের পোশাকের কার্যাদেশ বাড়াচ্ছেন। রপ্তানিকারকদের তথ্যমতে, গত চার-পাঁচ বছরে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বাজারে এ ধরনের পোশাকের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের উৎপাদকদের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও বেড়েছে। এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট, মন্টবেল, ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট ও ৫.১১ ট্যাকটিক্যালের মতো ব্র্যান্ড সরাসরি কিংবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাংলাদেশের কারখানা থেকে পোশাক সংগ্রহ করছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক শেখ মুস্তাফিজের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে উচ্চমূল্যের পোশাকের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত অন্তত ২০টি নতুন ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে কার্যাদেশ দেওয়া শুরু করেছে। তবে ব্যবসায়িক গোপনীয়তার কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডের কার্যাদেশের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয় না।
বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে উচ্চমূল্যের পণ্যের প্রকৃত অংশ কত, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে শিল্পোদ্যোক্তাদের ধারণা, গত এক দশকে এ ধরনের পোশাকের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিজিএমইএর সহসভাপতি মিজানুর রহমানের মতে, এক দশক আগে দেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে প্রিমিয়াম পণ্যের হিস্যা ছিল প্রায় ৩ শতাংশ, যা বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, কয়েকজন উদ্যোক্তার হিসাবে এ হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ, এমনকি ২০ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আউটারওয়্যার, ড্রেসেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার ও স্যুটের মতো উন্নত পোশাক ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ ছিল। অথচ একই সময়ে আন্তর্জাতিক তৈরি পোশাক বাজারে এসব পণ্যের সম্মিলিত হিস্যা ছিল ৩০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের পোশাকের যে চাহিদা রয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো অনেক কম।
শেখ মুস্তাফিজের হিসাবে, এক দশক আগে বাংলাদেশ প্রায় ২০০ কোটি ডলারের উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি করত। বর্তমানে সেই অঙ্ক ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পোশাক রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩৮৭০ কোটি ডলার। এর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যের পোশাকের হিস্যা হলে এ খাত থেকে আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৮৭ কোটি থেকে ৫৮১ কোটি ডলার।
উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী ইতিমধ্যে সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। টিম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১২ কোটি ডলারের জ্যাকেট ও বিভিন্ন ধরনের আউটারওয়্যার রপ্তানি হয়। এর প্রায় ৬০ শতাংশই প্রিমিয়াম পণ্য। গ্রুপটির মোট বার্ষিক রপ্তানি আয় ৩০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। টমি হিলফিগার, কেলভিন ক্লেইন, এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট ও মন্টবেলের মতো ব্র্যান্ডে তাদের কারখানায় তৈরি পোশাক সরবরাহ করা হয়।
আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে অবস্থিত ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড মূলত বিয়ের পোশাক তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি ব্রাইডাল ড্রেসের আন্তর্জাতিক খুচরামূল্য ৪০০ থেকে ১০০০ ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি পোশাক রপ্তানি করেছে, যার প্রায় পুরোটাই উচ্চমূল্যের পণ্য।
অন্যদিকে, এনার্জি প্যাক ফ্যাশনস লিমিটেডের বার্ষিক প্রায় ১০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির ৯০ শতাংশই স্যুট ও ব্লেজার। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হুমায়ুন রশীদের তথ্যমতে, তাদের তৈরি কোনো কোনো ব্লেজারের খুচরামূল্য ৯০০ ইউরো পর্যন্ত। ইতালির ক্রেতারাও নিজস্ব নকশা ও কাপড় ব্যবহার করে বাংলাদেশের কারখানায় বিশেষায়িত পোশাক তৈরি করাচ্ছেন।
এ ছাড়া ইয়ংওয়ান করপোরেশন, ডিবিএল গ্রুপ, স্নোটেক্স, এপিলিয়ন, এসকিউ গ্রুপ, স্কয়ার, উর্মি, ইউনিভার্সাল, ফকির গ্রুপ ও অনন্ত গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে যুক্ত রয়েছে। দেশে প্রায় তিন হাজার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা থাকলেও এর মধ্যে কতটি উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি করে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, এ ধরনের কারখানার সংখ্যা ১০০-এর বেশি হতে পারে।
উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ব্যবসায়িক মুনাফার চাপ। শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামাল, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ পোশাকে প্রতিযোগিতামূলক দামে ব্যবসা করা কঠিন হচ্ছে। অনন্ত গার্মেন্টসের পরিচালক রিজওয়ান জাহির খানের মতে, সাধারণ পোশাকে মুনাফার হার ২ থেকে ৩ শতাংশে ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিপরীতে, প্রিমিয়াম পোশাকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি মুনাফার সুযোগ রয়েছে।
উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্ষেত্রে উন্নত মানের কাপড়, বিশেষায়িত উপকরণ, জটিল সেলাই, উন্নত ফিনিশিং ও নিখুঁত টেইলারিংয়ের প্রয়োজন হয়। ফলে এসব পণ্য উৎপাদনে কারিগরি দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো বিশেষায়িত জ্যাকেটে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক ফাইবারের দাম প্রতি কেজিতে ১২০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যেখানে সাধারণ ফাইবারের দাম অনেক কম।
শুধু উৎপাদনমূল্য দিয়ে অবশ্য কোনো পোশাককে উচ্চমূল্যের বলা যায় না। ব্র্যান্ডের পরিচিতি, বাজারে পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং উৎপাদনে প্রয়োজনীয় শ্রমঘণ্টাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রচলিত ধারণায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০ ডলারের বেশি খুচরামূল্যের পোশাককে অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ব্র্যান্ডভেদে এ সংজ্ঞা ও মানদণ্ডে পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ উচ্চমূল্যের পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। তবে এসব দেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে গিয়ে ক্রেতারা এখন বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি রাজনৈতিক সমাবেশে পরা স্যুট বাংলাদেশের অনন্ত গ্রুপের কারখানায় তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিকপক্ষ দাবি করেছে। একইভাবে, গত এপ্রিলে চাঁদ প্রদক্ষিণ করা মার্কিন নভোচারীদের পোশাকও বাংলাদেশের একটি কারখানায় তৈরি হয়েছিল বলে মালিকপক্ষ জানিয়েছে। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশেষায়িত পোশাক তৈরির সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। উচ্চমানের কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কম দামের পোশাক উৎপাদনকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ভাবমূর্তি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে মান নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাও জরুরি।
রপ্তানিকারকদের মতে, বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে পরীক্ষামূলক কার্যাদেশ দিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের একটি অংশ এখন ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে। এতে ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাধারণ পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশেষায়িত ও প্রিমিয়াম পণ্যে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প শুধু রপ্তানি আয়ই বাড়াবে না, বৈশ্বিক বাজারে নিজের অবস্থানও আরও শক্তিশালী করতে পারবে।

বাংলাদেশে ৬৩৫ কোটি ডলারের জাপানি বিনিয়োগের উদ্যোগ

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছে জাপান। এ বিনিয়োগের আওতায় গাড়ি উৎপাদন, অন্যান্য শিল্প খাত এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রগুলো গুরুত্ব পেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের আলোচনায় এ উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি ইয়েনের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার বিষয়ে সম্মত হতে পারে জাপান। বর্তমান হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলার। তবে বিনিয়োগ পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপরেখা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।

চার দিনের সরকারি সফরে সোমবার সকালে টোকিও পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ সফরে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশের গাড়ি উৎপাদন ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্পে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণেও বিনিয়োগ আসতে পারে। বাংলাদেশে জাপানের সংশ্লিষ্টতায় গড়ে ওঠা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণও এ উদ্যোগের অংশ হতে পারে।

বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে জাপানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশনসহ বিভিন্ন পক্ষ যুক্ত রয়েছে। এসব অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ এলে শিল্পকারখানা স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পণ্য তৈরির সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে বিনিয়োগ গুরুত্ব পাবে

সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন তিনি।

বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উন্নয়ন সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় স্থান পেতে পারে।

সফরকালে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেরা-সহ জাপানের বড় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, অর্থায়ন, শিল্প অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থায়ন ও নীতিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ সুগম হতে পারে।

ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে অর্থনৈতিক ফোরাম

টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা অংশ নেবেন। এ আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, উৎপাদনশিল্পের সম্ভাবনা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়গুলো তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।

বুধবার ইউনিক্লোর প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন এবং প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার নাগোয়া শহরে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোটোমাচি কারখানা পরিদর্শন করবেন তিনি। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাপানের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য রয়েছে।

বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিও (ইপিএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চুক্তিটির কার্যকর বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করা এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য।

প্রস্তাবিত বিনিয়োগ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গাড়ি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ জনশক্তি, উন্নত অবকাঠামো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। জাপানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেলে তা বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াচ্ছে বাংলাদেশ

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশ। সংস্থাটির হিসাব বলছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলার, যেখানে ভারতের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। তবে মাথাপিছু আয়ের এই অগ্রগতি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ।

মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশের এই অগ্রগতি গত দুই দশকে দেশের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রতিফলন। স্বাধীনতার পর নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক পরিসরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং শ্রমবাজারে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এ অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সামগ্রিক অর্থনীতির আকারে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়। কিন্তু জনসংখ্যার ভিত্তিতে গড় অর্থনৈতিক উৎপাদনের হিসাব করলে বাংলাদেশ এবার প্রতিবেশী দেশটির চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে। তবে মাথাপিছু জিডিপি কোনো দেশের মানুষের প্রকৃত আয় কিংবা জীবনযাত্রার মানের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না। এ ক্ষেত্রে আয়বণ্টন, পণ্য ও সেবার মূল্য, কর্মসংস্থান এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে অবশ্য দুই দেশের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। চলতি বছর ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে। অর্থাৎ মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও অর্থনীতির সামগ্রিক গতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে দেশটি চাপের মুখে রয়েছে।

মূল্যস্ফীতিও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চাপে খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার মূল্য বিবেচনায় ভারতের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। ফলে মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অগ্রগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সমানভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দুই দেশের অবস্থানে ওঠানামার পর ২০২৯ সালের দিকে মাথাপিছু আয়ে ভারত আবারও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

দুই দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত পার্থক্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। অন্যদিকে ভারতের অর্থনীতি প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা, শিল্প উৎপাদন এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর ভিত্তি করে তুলনামূলকভাবে বহুমুখী হয়ে উঠেছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে দুই দেশের ওপর প্রভাবও ভিন্নভাবে পড়তে পারে।

এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বিঘ্ন দুই দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নৌপথে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের চালান পরিবহন ব্যয়বহুল হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও চাপে পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের কাছে মাথাপিছু জিডিপি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি গড় হিসাবনির্ভর। দেশের সম্পদ ও আয় কতটা সুষমভাবে বণ্টিত হচ্ছে, কত মানুষের আয় বাড়ছে কিংবা মূল্যস্ফীতির কারণে কতটা ক্রয়ক্ষমতা কমছে—এসব বিষয় এই সূচক থেকে সরাসরি বোঝা যায় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তাই মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক অর্জন হলেও একে অর্থনৈতিক সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং আয়বৈষম্য কমানোর ওপরই নির্ভর করবে এই অগ্রগতি সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি নিয়ে আসবে।