সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্বের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম
/ month
placeholder text
spot_img
সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
Home Blog Page 14

ভ্যাট রিটার্নে বাড়ল সময়

০

অর্থজগত প্রতিবেদন

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট কর মেয়াদের অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়িয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো জরিমানা ছাড়াই বকেয়া ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে পারবে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) এনবিআরের ভ্যাট মনিটরিং, পরিসংখ্যান ও সমন্বয় শাখার জারি করা এক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।

আদেশে বলা হয়েছে, জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এর ভ্যাট রিটার্নসংক্রান্ত সংশোধিত বিধানের কারণে কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন কর মেয়াদের মধ্যে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন এ ব্যবস্থার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান জুলাই ও আগস্ট কর মেয়াদের রিটার্ন নির্ধারিত সময়ে জমা দেয়নি।

এ পরিস্থিতিতে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৬৪-এর উপধারা (৩)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো জুলাই ও আগস্ট কর মেয়াদের রিটার্ন দাখিল করেনি, তাদের জন্য অতিরিক্ত সময় দিয়েছে এনবিআর। আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করা হলে কোনো ধরনের জরিমানা আরোপ করা হবে না।

আদেশে আরও বলা হয়েছে, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন কর মেয়াদের ভ্যাট রিটার্নই ১৫ অক্টোবরের মধ্যে অনলাইনে সিস্টেমে দাখিল করতে হবে।

ফলে নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পারা প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে জরিমানা থেকে ছাড় পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে তিন কর মেয়াদের রিটার্ন একসঙ্গে হালনাগাদ করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

অনলাইন জুয়ার বিস্তার, বাড়ছে অর্থপাচার ও আসক্তির ঝুঁকি

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন উত্তরার বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন (ছদ্মনাম)। ২০২২ সালে কৌতূহল থেকে অনলাইনে জুয়া খেলা শুরু করেছিলেন তিনি। শুরুতে ১০০–২০০ বা ৫০০ টাকা করে খেললেও ধীরে ধীরে সেটি পরিণত হয় আসক্তিতে। কখনো লাভ, কখনো লোকসানের মধ্য দিয়ে একপর্যায়ে বড় অঙ্কের অর্থ হারাতে থাকেন তিনি।
২০২৫ সালে একদিন মাত্র ১০ হাজার টাকা দিয়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা জেতেন ফরহাদ। ওই অর্থের একটি অংশ দিয়ে ধারদেনা পরিশোধ ও মোটরসাইকেল কেনার পর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে আরও বড় লাভের আশায় খেলতে থাকেন। কিন্তু এরপর আর ভাগ্য ফেরেনি। একপর্যায়ে জেতা ৩ লাখ টাকাও শেষ হয়ে যায়। হারানো অর্থ ফিরে পাওয়ার আশায় ধার করে আবার খেলতে গিয়ে আরও প্রায় ৬ লাখ টাকা হারান তিনি। সব মিলিয়ে এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ১০ লাখ টাকা খুইয়ে জুয়ার ভয়াবহতা বুঝতে পারেন ফরহাদ। পরে তিনি এই আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন।
ফরহাদের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। শহর থেকে গ্রাম—দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়া। সহজে বড় অঙ্কের অর্থ আয়ের প্রলোভন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং মোবাইলভিত্তিক লেনদেনের সহজলভ্যতা এ প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধ, অর্থ পাচার ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের ঝুঁকিও।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ে আসক্ত মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ তরুণ ও যুবক। কার্যকর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ২০২৭ সাল নাগাদ আসক্তের সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে ওই সমীক্ষায়।

চার ধাপে বিদেশে যায় জুয়ার অর্থ

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, অনলাইন জুয়ার অর্থ সাধারণত চারটি ধাপে হাতবদল হয়ে শেষ পর্যন্ত দেশের বাইরে পাচার হয়। প্রথম ধাপে থাকে জুয়াড়ি, এরপর স্থানীয় এজেন্ট, সুপার এজেন্ট এবং সর্বশেষে মূল হোতা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন, পরিচিতজনের মাধ্যমে পাওয়া লিংক কিংবা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রচারণা দেখে অনেকেই এসব জুয়ার সাইট ও অ্যাপে যুক্ত হন। এসব প্ল্যাটফর্মে সাধারণত স্লট, ফিশিং ও লাইভ ক্যাসিনোর মতো বিভিন্ন ধরনের জুয়ার ব্যবস্থা থাকে।

জুয়া খেলতে প্রথমে অ্যাকাউন্টে অর্থ বা ‘বেট মানি’ জমা দিতে হয়। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে নির্দিষ্ট নম্বরে টাকা পাঠালে তা জুয়ার অ্যাকাউন্টে যুক্ত হয়। খেলায় হারলে অর্থ চলে যায়, আর জিতলে একই ব্যবস্থায় অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে।

জুয়াড়িদের কাছ থেকে আসা ছোট ছোট অঙ্কের অর্থ প্রথমে জমা হয় স্থানীয় এজেন্টদের এমএফএস অ্যাকাউন্টে। এসব এজেন্ট সাধারণত জুয়ার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই নিয়োগ পেয়ে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরও নিয়মিত পরিবর্তন করা হয়।

স্থানীয় এজেন্টরা টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যমে সুপার এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে সংগৃহীত অর্থ সুপার এজেন্টদের এমএফএস বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। এর বিনিময়ে স্থানীয় এজেন্টরা ০.৪ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পান।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, সুপার এজেন্টরা তুলনামূলকভাবে বেশি প্রযুক্তি-দক্ষ। তারা জুয়ার সাইট পরিচালনা এবং অর্থ স্থানান্তরের পাশাপাশি ডিজিটাল হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো মাধ্যম ব্যবহার করে অর্থ বিদেশে পাচারে ভূমিকা রাখেন। শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ পৌঁছে যায় জুয়ার মূল হোতাদের কাছে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, চার ধাপে অনলাইন জুয়ার অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। স্থানীয় এজেন্টরা কমিশনের বিনিময়ে এই অর্থ স্থানান্তরে সহযোগিতা করেন। তাদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছে।

ধরা পড়ছে এজেন্ট, অধরা মূল হোতারা

অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চললেও এর মূল নিয়ন্ত্রকদের নাগাল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ১১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তাদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে ১২টি মামলা। এর মধ্যে ৮৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ গত সোমবার রাজধানীর রামপুরা থেকে সজীব দে (৩৭) ও মো. মাসুদ রানা (৩০) নামে দুই এজেন্টকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার।

অন্যদিকে, গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস হওয়ার পর ওই আইনে ১১টি মামলায় ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ-দক্ষিণ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ জন চীনা নাগরিকও রয়েছেন।

তবে সিআইডি ও ডিবির অভিযানে আটক ব্যক্তিদের বড় অংশই স্থানীয় এজেন্ট বা সুপার এজেন্ট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মূল হোতারা দেশের বাইরে থেকে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করায় তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় এজেন্টদের সঙ্গেও মূল হোতাদের সরাসরি যোগাযোগ বা পরিচয় থাকে না। ফলে অর্থের প্রবাহ শনাক্ত করা গেলেও এর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা জটিল হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চীন, রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসব জুয়ার সাইট ও অ্যাপ পরিচালিত হচ্ছে।

ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (দক্ষিণ) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, অনলাইন জুয়া সাইবার অপরাধের একটি অংশ এবং এর কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই। বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হওয়ায় নিয়ন্ত্রণে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

তার মতে, অল্প সময়ে সামান্য অর্থ বিনিয়োগ করে বড় অঙ্কের টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে—এমন ধারণাই অনেককে অনলাইন জুয়ার দিকে টেনে নিচ্ছে। একবার জড়িয়ে পড়ার পর ক্রমেই আসক্তি তৈরি হয়। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলোও এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ ও দেশের বাইরে পাচার করছে।

তবে অভিযান ও নজরদারির কারণে অনলাইন জুয়ার বিস্তার কিছুটা কমেছে বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইতোমধ্যে বেশ কিছু সার্ভার ও অ্যাপ বন্ধ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বছরে বাড়ছে জুয়ার বাজার

জিইডির সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার আনুমানিক ৬২ থেকে ৬৮ মিলিয়ন ডলার। প্রতিবছর এ বাজার ৪.৭ থেকে ৬.১ শতাংশ হারে বাড়ছে।

অন্যদিকে, চলতি বছরের ১৫ জুলাই প্রকাশিত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক চিত্র। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ৬ হাজার ২২২টি ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাকাউন্টে মোট ৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা জমা হয়েছে। একই সময়ে এসব অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা।

এই পাঁচ বছরে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে বিএফআইইউ পেয়েছে ১ হাজার ৮৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) ও সন্দেহজনক কার্যক্রম প্রতিবেদন (এসএআর)। ২০২০ সালে এমন প্রতিবেদনের সংখ্যা ছিল ৫০টি। পরের বছর তা বেড়ে ১০৮টি, ২০২২ সালে ২২৭টি, ২০২৩ সালে ৪৬৮টি এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ৪৬টিতে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন কয়েক গুণ বেড়েছে।

চলতি বছর অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত ৭৩৪টি এমএফএস ও ২২৪টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্থগিতের জন্য বিএফআইইউকে অনুরোধ করেছে সিআইডি। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, এসব অ্যাকাউন্ট থেকে ৪৯ লাখ টাকা জব্দ করেছে বিএফআইইউ।

একই সময়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭৬৩টি ওয়েবসাইট ও অ্যাপ শনাক্ত করে সেগুলো বন্ধের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে সুপারিশ করেছে সিআইডি।

আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে বাড়ছে সামাজিক ঝুঁকি

অনলাইন জুয়ার ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এর প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তাওহীদুল হক বলেন, জুয়ার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে তরুণদের কেউ কেউ চুরি করছেন, মূল্যবান জিনিস বিক্রি করছেন কিংবা পরিবারের সদস্যদের অজান্তে তাদের অর্থ ব্যবহার করছেন।

অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বেতন পাওয়ার পর পুরো অর্থ জুয়ায় ব্যয় করে ফেলছেন। পরে অর্থের প্রয়োজন মেটাতে ধার করে আবার জুয়ায় যুক্ত হচ্ছেন। এতে পরিবারে আর্থিক সংকটের পাশাপাশি পারিবারিক শান্তি ও সম্পর্কও হুমকির মুখে পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার মতে, শুধু জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না। জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, প্রচার, অর্থ সংগ্রহ ও পাচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও চক্রগুলোকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি অনলাইন জুয়ার সাইট পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার ইউনিটগুলোকে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ফরহাদের মতো কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো এই চক্রে আটকে রয়েছেন। ফলে অনলাইন জুয়া এখন শুধু ব্যক্তিগত অর্থ হারানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তরুণদের আসক্তি, পারিবারিক বিপর্যয়, অবৈধ অর্থের প্রবাহ এবং আন্তঃদেশীয় অর্থ পাচারের মতো বড় ঝুঁকি।

২৪/৭ শুল্কায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি

০

অর্থজগত প্রতিবেদন
বন্দর ও কাস্টম হাউসে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন শুল্কায়ন কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতায় এর সুফল পুরোপুরি মিলছে না। বিশেষ করে ব্যাংকিং সময়ের বাইরে অর্থ পরিশোধের সুযোগ সীমিত থাকা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের ছুটির দিনে সীমিত উপস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম ও ঢাকা কাস্টম হাউসে পণ্য খালাসের গতি ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমদানিকারকদের দ্রুত পণ্য ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।

বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে গত ১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বন্দর ও কাস্টম হাউসগুলোতে ২৪/৭ কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর আওতায় সপ্তাহের সাত দিনই শুল্কায়ন ও পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সচল রাখার কথা। তবে বাস্তবে কাস্টমসের কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যাংকিং ও অন্যান্য সহায়ক সেবার সময়সূচির সামঞ্জস্য না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না।

সমস্যার অন্যতম বড় জায়গা আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা। রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট বা আরটিজিএস ব্যাংকিং সময়ের বাইরে এবং সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে। ফলে এসব সময়ে বন্দরের বিল তৈরি হলেও আমদানিকারক বা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা তাৎক্ষণিকভাবে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন না। একই সঙ্গে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ বা এনপিএসবির লেনদেন সীমাও বড় অঙ্কের বন্দর বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে।

পণ্য খালাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত দুই ডজনের বেশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছুটির দিনের সীমিত কার্যক্রম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ফলে কাস্টমস ২৪ ঘণ্টা চালু থাকলেও পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল একইভাবে সচল না থাকায় কাঙ্ক্ষিত গতি পাওয়া যাচ্ছে না।

২৪ ঘণ্টা পেমেন্ট সেবা চায় বন্দর

নিরবচ্ছিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আরটিজিএস ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা এবং এনপিএসবির লেনদেনসীমা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। এ বিষয়ে গত ১ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় সংস্থাটি।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ রেফায়েত হামিম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, বন্দর ২৪ ঘণ্টা সচল থাকায় গভীর রাত এবং শুক্রবার-শনিবারসহ সরকারি ছুটির দিনেও বিপুলসংখ্যক বিল অনলাইনে তৈরি হচ্ছে। বিলিং ব্যবস্থা পুরোপুরি অনলাইন হলেও ব্যাংকিং চ্যানেল ও পেমেন্ট গেটওয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে ডিজিটাল পেমেন্টের পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।

বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, যেকোনো সময় বিভিন্ন অঙ্কের বিল তৈরি হতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং সময়ের পর এবং ছুটির দিনে আরটিজিএস বন্ধ থাকায় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা সঙ্গে সঙ্গে বিল পরিশোধ করতে পারেন না। আবার এক লাখ টাকার কম অঙ্কের বিল আরটিজিএসের মাধ্যমে পাঠানোর সুযোগও নেই।

এনপিএসবির ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট সীমা। ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে দিনে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং একবারে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা যায়। করপোরেট অ্যাকাউন্টে দৈনিক সীমা ২৫ লাখ টাকা এবং একক লেনদেনে ৫ লাখ টাকা। অথচ বন্দরের বিভিন্ন অপারেশনাল বিল অনেক সময় এসব সীমার চেয়ে বেশি হওয়ায় এনপিএসবির মাধ্যমে সেগুলো পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। ফলে ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমদানিকারকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ছুটিতে কমেছে কনটেইনার ডেলিভারি

চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও এ সমন্বয়হীনতার প্রভাব দেখা গেছে। গত ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর সাপ্তাহিক ছুটিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ১ হাজার ৩২৮টি বিল অব এন্ট্রি দাখিল হয়। এর মধ্যে ৩১টি চালানের অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন করে ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়।

তবে একই সময়ে বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারির পরিমাণ স্বাভাবিক কর্মদিবসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বন্দর থেকে ২ হাজার ৪২৩ টিইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছে। স্বাভাবিক কর্মদিবসে যেখানে এ সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টিইইউএস।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, বিল অব এন্ট্রি দাখিল পণ্য খালাসের প্রাথমিক ধাপ মাত্র। এরপর অ্যাসেসমেন্ট, শুল্ক পরিশোধ, শিপিং এজেন্টের কাছ থেকে ডেলিভারি অর্ডার সংগ্রহ এবং বন্দর থেকে পণ্য বের করে নেওয়াসহ একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এসব ধাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সমানভাবে সচল না থাকলে শুধু কাস্টমস চালু রেখে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও ছুটির দিনে ট্রাক ও ট্রেইলারের সংকট এবং আমদানিকারকদের সীমিত কার্যক্রমকে কম ডেলিভারির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে।

ঢাকা বিমানবন্দরেও বাড়ছে খালাস না হওয়া পণ্য

একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। ছুটির দিনে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের উপস্থিতি কম থাকায় আমদানি পণ্য খালাসের গতি কমে যাচ্ছে। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক রাগীব সামাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন জমতে থাকা খালাস না হওয়া পণ্যের পরিমাণ ৪০০ থেকে ৫০০ টনে পৌঁছেছে।

এ অবস্থায় কাস্টমসকে সাত দিনের মধ্যে অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন করার বিধান কার্যকর করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন পড়ে থাকা চালান নিলামে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের পক্ষ থেকেও ছুটির দিনে অতিরিক্ত শ্রম ব্যয় মেটাতে প্রণোদনা বা বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে।

সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া ২৪/৭ কার্যক্রম কঠিন

ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানিকারকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে বন্দরে পণ্য ফেলে রাখেন না। কাস্টমস, ব্যাংকিং, বন্দর এবং অন্যান্য সেবার মধ্যে কোনো একটি পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হলেই পুরো খালাস প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে। বিশেষ করে পণ্য আমদানির সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে অন্তত ২৬টি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকায় একটি প্রতিষ্ঠানের সীমিত কার্যক্রমও পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের আরেকটি অভিযোগ, ছুটির দিনে বিভিন্ন শাখা থেকে কর্মকর্তাদের এনে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট শাখার নির্দিষ্ট শুল্কায়ন পদ্ধতি, এসআরও এবং মূল্যায়নসংক্রান্ত নিয়ম সম্পর্কে তাদের সবার সমান অভিজ্ঞতা থাকে না। এতে কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পণ্য ছাড়ের প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হয়।

ব্যবসায়ীদের মতে, সরকার যদি সাত দিনই কাস্টমস কার্যক্রম চালু রাখতে চায়, তাহলে স্বাভাবিক কর্মদিবসের মতো পর্যাপ্ত জনবল, ব্যাংকিং সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট সব সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কাস্টমসের দরজা খোলা রাখলেই ২৪/৭ পণ্য খালাস ব্যবস্থা কার্যকর হবে না।

রাজস্ব আদায়ের চাপও বাড়ছে

২৪/৭ কাস্টমস কার্যক্রম চালুর সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৪ হাজার ১৭.৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫১২.৬৬ কোটি টাকা।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, বন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি ২৪/৭ চালু হলে আমদানি পণ্যের শুল্ক দ্রুত আদায় হবে এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়বে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, এ উদ্যোগের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে পুরো পণ্য খালাস ব্যবস্থার সমন্বিত সক্ষমতার ওপর।

কাস্টমস, বন্দর, ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক—প্রতিটি পক্ষ একই সময়সূচিতে এবং একই গতিতে কাজ করতে না পারলে ২৪/৭ শুল্কায়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে। তাই বন্দর ও কাস্টমসের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত উপস্থিতি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কথোপকথনের অপেক্ষায়…

০

দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বিশিষ্টজন ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের ভাবনা, অভিজ্ঞতা, কর্মজীবন ও সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় নিয়ে আমাদের বিশেষ সাক্ষাৎকার আয়োজন। তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ ভাবনার নানা দিক উঠে আসবে এসব কথোপকথনে। পাঠকদের জন্য চিন্তা ও তথ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যয়ে খুব শিগগিরই প্রকাশিত হবে আমাদের নেয়া পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি